পাকিস্তান-বাংলাদেশের মধ্যে মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস নামে কি কোনো ট্রেন চলতো?

দীর্ঘদিন ধরে “হারিয়ে যাওয়া একটি ট্রেনের নাম মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস,উর্দুতে মাশরিক শব্দের অর্থ পূর্ব এবং মাগরিব শব্দের অর্থ হলো পশ্চিম। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে যোগাযোগের উদ্দেশ্য ও পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দুই ভুখন্ডকে সংযোগ করতে এটি ছিল ঐতিহাসিক ট্রেন। অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) মধ্যে চলাচলকারী একটি ট্রেন পরিসেবা। এই ট্রেনটি  ১৯৫০-১৯৫৫ সালের দিকে চলাচল করতো” শীর্ষক শিরোনামে একটি তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে আসছে।

ফেসবুকে প্রচারিত এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে
পোস্টগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে পাকিস্তানে ১৯৫০-১৯৫৫ সালে মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস নামে ট্রেন চলাচলের দাবিটি সঠিক নয় বরং এই তথ্যটি উইকিপিডিয়া সূত্রে ভিত্তিহীনভাবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচার হয়ে আসছিলো।

যা দাবি করা হচ্ছে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলোতে দাবি করা হচ্ছে, মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস একটি হারিয়ে যাওয়া ট্রেনের নাম। উর্দুতে মাশরিক শব্দের অর্থ পূর্ব এবং মাগরিব শব্দের অর্থ হলো পশ্চিম। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে যোগাযোগের উদ্দেশ্য ও পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া দুই ভুখন্ডকে সংযোগ করতে এটি ছিল ঐতিহাসিক ট্রেন। এই ট্রেনটি  ১৯৫০-১৯৫৫ সালের দিকে চলাচল করতো।

পোস্টগুলোর তথ্যানুযায়ী, ভারতের ভূখন্ড ব্যবহার করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংযোগ করতে কয়েকদফা মিটিং হয় দুই দেশের মধ্যে। এতে সিদ্ধান্ত হয় লাহোর থেকে দিল্লি অবধি একটি ট্রেন চলাচল করবে ও আরেকটি ট্রেন পূর্ব পাকিস্তান অবধি চলবে, সেটি হবে প্যাসেঞ্জার ট্রেন। অতঃপর ট্রেনটি পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের কোহ-ই-তাফতান (Kuh-e-Taftan) থেকে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্রগ্রাম পর্যন্ত চলতো। 

ট্টেনটি ভারতের পাঞ্জাবের আটারি(Attari) হয়ে বাংলাদেশের দর্শনা হয়ে ঢুকতো। চলার পথে এই ট্রেন ভারতের প্রায় ১৯৮৬ কিলোমিটার রেল ট্র্যাক এবং রোলিং স্টক ব্যবহার করতো। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান আসতে ট্রেনটির প্রায় ৫/৬ দিন লেগে যেতো ও যাত্রাপথে ফেরি ও পারাপার হতে হতো। 

পোস্টগুলোর  দাবি অনুযায়ী, এটি একই রেক নিয়ে চলাচল করতো না। লম্বা রাস্তা চলতে গিয়ে পথিমধ্যে ট্রেনের রেক ও কয়েকদফা বদল করতে হতো। যাত্রীরা এক ট্রেন থেকে নেমে অন্য ট্রেনে উঠতো। পূর্ব পাকিস্তানে নদী পারাপারে তখন ফেরী ব্যাবহার করতো বলে জানা যায়।

এছাড়া এসব পোস্টে আরও বলা হয়, নথিপত্র না থাকায় ট্রেনটির ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যায়নি।

মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত তথ্যের সূত্রপাত ও সত্যতা যাচাই

মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত তথ্যের সূত্রপাত অনুসন্ধানেকি-ওয়ার্ড অনুসন্ধানের মাধ্যমে ভারতীয় গণমাধ্যম OpIndia তে ২০২১ সালের ১৮ জুন “Information about a fictitious train on ‘reliable’ Wikipedia, picked up by websites and academic journals: Here is how it originated” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। 

প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত তথ্যের সূত্রপাত ২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর PAKHIGHWAY নামে একজন উইকিপিডিয়া সম্পাদকের মাধ্যমে। 

তিনি উইকিপিডিয়ার Pakistan Eastern Railway এর উইকিপেজ সম্পাদনা করে সেখানে ৫২১৪ নাম্বার বিশিষ্ট মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত তথ্য লিপিবদ্ধ করেন৷ 

এই সম্পাদনা অনুসারে, ট্রেনটি ১৯৫০ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত চলাচল করতো। যেটি পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের কোহ-ই-তাফতান (Kuh-e-Taftan) থেকে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্রগ্রাম পর্যন্ত চলতো। ট্টেনটি ভারতের আটারি(Attari) ও বেনাপোলের মধ্যে ১৯৮৬ কিলোমিটার বা ১২৪৫ মাইল ভারতের রেলপথ এবং রোলিং স্টক ব্যবহার করতো।

OpIndia এর প্রতিবেদনটির সূত্রে উইকিপিডিয়া থেকে এই তথ্যটি সরিয়ে ফেলার পূর্বের Pakistan Eastern Railway এর উইকিপেজে মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত তথ্যের উপস্থিতির সত্যতা পাওয়া যায়।

এছাড়া প্রতিবেদনটি থেকে আরও জানা যায়, মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত তথ্যটি ভুয়া। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি চলাচলকারী এই ধরনের ট্রেন সম্পর্কিত কোনো প্রমাণ নেই। যদি থাকতো তবে সেটার ঐতিহাসিক প্রমাণ থাকতো। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল ও পাকিস্তানের জাতির পিতা মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ১২৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ট্রানজিট করিডোরের প্রস্তাব দিয়েছিলেন৷ তবে সে সময় ব্রিটিশ সরকার বা ভারতের কংগ্রেস পার্টি কেউই এটিতে রাজি হয়নি।

এছাড়া OpIndia এর প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, উইকিপিডিয়ায় মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত তথ্যে ত্রুটিপূর্ণ যুক্তি রয়েছে। দুই পাকিস্তানের মধ্যে চলাচলকারী এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ট্রেন পাকিস্তানের একদম পশ্চিমের একটি পর্বতঘেরা ছোট শহর কোহ-ই-তাফতান রেল স্টেশন থেকে চালানোর কোনো কারণ নেই৷ এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি ট্রেন পশ্চিম পাকিস্তানের বড় শহর যেমন লাহোর বা করাচী থেকে চালানোর কথা। একই কথা প্রযোজ্য পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও৷ কারণ, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে চলা এমন কোনো ট্রেনের ঢাকাতেই আসার কথা।

পরবর্তীতে রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানেও মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত বিশ্বস্তসূত্রে কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় না।  

এছাড়া অনুসন্ধানে দেখা যায়, উইকিপিডিয়া থেকে ২০২০ সালের ১৬ আগস্ট মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত তথ্যটির কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র উল্লেখ না থাকায় মুছে ফেলা হয়েছে। 

পরবর্তীতে Pakistan Eastern Railway এর বর্তমান উইকিপেজে এই সম্পর্কিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত তথ্যটি উইকিপিডিয়া থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত তথ্য উইকিপিডিয়ার পেজে PAKHIGHWAY নামে যে উইকিপিডিয়া সম্পাদক যুক্ত করেছিলেন, সেই সম্পাদককে একাধিক একাউন্ট ব্যবহার সহ একাধিক অভিযোগে উইকিপিডিয়া থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, উইকিপিডিয়ায় যিনি মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত তথ্য যুক্ত করেছিলেন, তিনিও কোনোও নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রদানকারী নন।

উল্লেখ্য, পাকিস্তানের লাহোরের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘Why Pakistan Railways Has Failed To Perform: A Special Focus On Passenger Perspective‘ শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রেও উইকিপিডিয়ার সূত্রে মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল।

মূলত, ২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর PAKHIGHWAY নামে একজন উইকিপিডিয়া সম্পাদক Pakistan Eastern Railway এর উইকিপেজ সম্পাদনা করে সেখানে ৫২১৪ নাম্বার বিশিষ্ট মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত তথ্য লিপিবদ্ধ করেন৷ সেখানে তিনি লিখেন, ট্রেনটি ১৯৫০ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত চলাচল করতো। যেটি পশ্চিম পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের কোহ-ই-তাফতান (Kuh-e-Taftan) থেকে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্রগ্রাম পর্যন্ত চলতো। ট্টেনটি ভারতের আটারি(Attari) ও বেনাপোলের মধ্যে ১৯৮৬ কিলোমিটার বা ১২৪৫ মাইল ভারতের রেলপথ এবং রোলিং স্টক ব্যবহার করতো। পরবর্তীতে মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত এই তথ্যগুলোই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও ছড়িয়ে পড়ে। তবে উইকিপিডিয়া কর্তৃপক্ষ ২০২০ সালের ১৬ আগস্ট মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস ট্রেন সম্পর্কিত তথ্যটির কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র উল্লেখ না থাকায় মুছে ফেলে। এছাড়া PAKHIGHWAY নামে ঐ সম্পাদককে একাধিক একাউন্ট ব্যবহার সহ একাধিক অভিযোগে উইকিপিডিয়া থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 

প্রসঙ্গত, উইকিপিডিয়া যে তথ্যের কোনো শতভাগ নির্ভরযোগ্য সূত্র নয় এবং উইকিপিডিয়া কিভাবে কাজ করে এ সম্পর্কে জানতে রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদন দেখুন এখানে। 

সুতরাং, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে পাকিস্তানে ১৯৫০-১৯৫৫ সালে মাশরিক-মাগরিব এক্সপ্রেস নামে ট্রেন চলাচলের দাবিটি সঠিক নয়; এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

RS Team
RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img