শিক্ষা ব্যবস্থায় হিন্দুদের প্রাধান্য দেখিয়ে প্রচারিত তালিকাটি সঠিক নয়

সম্প্রতি “একটি মুসলিম প্রধান দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কাদের হাতে চিন্তা করা যায়?” শীর্ষক শিরোনামে একটি তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। 

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানেএখানে। আর্কাইভ দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানেএখানে। 

ছড়িয়ে পড়া এই তথ্যটিতে দাবি করা হচ্ছে:

১. প্রাথমিক শিক্ষা অধিপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) শ্যামল কান্তি ঘোষ। 

২. পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সচিব বজ্র গোপাল ভৌমিক। 

৩. কারিগরি শিক্ষা অধিপ্তরের মহাপরিচালক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জনাব অশোক কুমার বিশ্বাস। 

৪. সৃজনশীল পদ্ধতি বাস্তবায়নকারী মাধ্যমিক শিক্ষা খাত উন্নয়ন কর্মসূচির (সেসিপ) যুগ্ম পরিচালক রতন কুমার রায়।

৫.সৃজনশীল পদ্ধতি বাস্তবায়নকারী মাধ্যমিক শিক্ষা খাত উন্নয়ন কর্মসূচির (সেসিপ) বিশেষজ্ঞ ড. উত্তম কুমার দাশ। 

৬. ঢাকা বোর্ডের উপ-কলেজ পরিদর্শক অদ্বৈত কুমার রায়।

৭. চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সচিব ড. পীযুষ কান্তি দন্ত।

৮. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সুবোধ চন্দ্র ঢালী। 

৯. বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়্যারম্যান নারায়ন চন্দ্র পাল। 

১০. ঢাকা বোর্ডের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শ্রীকান্ত কুমার চন্দ্র। 

১১. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব অজিত কুমার ঘোষ। 

১২. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব পতিত পাবন দেবনাথ।

১৩. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব অসীম কুমার কর্মকার। 

১৪. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-প্রধান স্বপন কুমার ঘোষ।

১৫. শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব শ্রী বনমালী ভৌমিক। 

১৬. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. অরুণা বিশ্বাস।

১৭. শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব স্বপন কুমার সরকার। 

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের পদের সঙ্গে তথ্যটিতে উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গের মিল নেই বরং দাবিকৃত ব্যক্তিদের নাম সম্বলিত একই তথ্য ২০১৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পাওয়া যায়।

প্রথম দাবি যাচাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটিতে দাবি করা হয়েছে বাংলাদেশ  প্রাথমিক শিক্ষা অধিপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) শ্যামল কান্তি ঘোষ।

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিপ্তরের বর্তমান  মহাপরিচালক (ডিজি) মো: মুহিবুর রহমান। তিনি গত ২৩ জুন থেকে এই পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

 তার আগে এই পদে দায়িত্ব পালন করেন সোহেল আহমেদ (অতিঃ সচিব)(অতিরিক্ত দায়িত্ব)। 

অপরদিকে ২০১৬ সাল থেকে ২০১৯ সাল এই অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন ড. মোঃ আবু হেনা মোস্তফা কামাল, এনডিসি (অতিঃ সচিব)। 

তবে শ্যামল কান্তি ঘোষ ২০০৯ সালের ১৪ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন।

দ্বিতীয় দাবি যাচাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটিতে দাবি করা হয়েছে পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সচিব বজ্র গোপাল ভৌমিক।

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) এর সচিব হচ্ছেন মোসাঃ নাজমা আখতার। 

তৃতীয় দাবি যাচাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটিতে দাবি করা হয়েছে কারিগরি শিক্ষা অধিপ্তরের মহাপরিচালক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জনাব অশোক কুমার বিশ্বাস। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কারিগরি শিক্ষা অধিপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালকশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো: ওমর ফারুক। তিনি ২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে এই পদে দায়িত্ব পালন করছেন৷ 

তার আগে এই ২০২১ সালের ১৪ মার্চ থেকে ২০২২ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন ড.মোঃ হেলাল উদ্দিন এনডিসি (অতিরিক্ত সচিব)। 

তবে অশোক কুমার বিশ্বাস ২০১৫ সালের  ২৯ জুন থেকে ২০১৯ সালের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছিলেন বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। 

চতুর্থ দাবি যাচাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটিতে দাবি করা হয়েছে সৃজনশীল পদ্ধতি বাস্তবায়নকারী মাধ্যমিক শিক্ষা খাত উন্নয়ন কর্মসূচির (সেসিপ) যুগ্ম পরিচালক রতন কুমার রায়।

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সৃজনশীল পদ্ধতি বাস্তবায়নকারী মাধ্যমিক শিক্ষা খাত উন্নয়ন কর্মসূচির (সেসিপ) যুগ্ম পরিচালক প্রফেসর ড. সামসুন নাহার।

পঞ্চম দাবি যাচাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটিতে দাবি করা হয়েছে সৃজনশীল পদ্ধতি বাস্তবায়নকারী মাধ্যমিক শিক্ষা খাত উন্নয়ন কর্মসূচির (সেসিপ) বিশেষজ্ঞ ড. উত্তম কুমার দাশ। 

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সৃজনশীল পদ্ধতি বাস্তবায়নকারী মাধ্যমিক শিক্ষা খাত উন্নয়ন কর্মসূচির (সেসিপ)‘বিশেষজ্ঞ’ বলে কোন পদ নেই।

ষষ্ঠ দাবি যাচাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটিতে দাবি করা হয়েছে ঢাকা বোর্ডের উপ-কলেজ পরিদর্শক অদ্বৈত কুমার রায়।

কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকা বোর্ডের উপ-কলেজ পরিদর্শক মোহাম্মদ রবিউল আলম।

সপ্তম দাবি যাচাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটিতে দাবি করা হয়েছে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সচিব ড. পীযুষ কান্তি দন্ত।

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সচিব প্রফেসর আবদুল আলীম।

অষ্টম দাবি যাচাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটিতে দাবি করা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সুবোধ চন্দ্র ঢালী। 

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে উপ প্রধান তথ্য কর্মকর্তা বলতে কোনো পদ নেই। বিপরীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের  তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ আবুল খায়ের।

অপরদিকে সুবোধ চন্দ্র ঢালী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের উপ-সচিব (কারিগরি-২) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। 

নবম দাবি যাচাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটিতে দাবি করা হয়েছে বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়্যারম্যান নারায়ন চন্দ্র পাল। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়্যারম্যান প্রফেসর মোঃ ফরহাদুল ইসলাম। 

দশম দাবি যাচাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটিতে দাবি করা হয়েছে ঢাকা বোর্ডের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শ্রীকান্ত কুমার চন্দ্র। 

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস. এম. আমিরুল ইসলাম।

একাদশ দাবি যাচাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটিতে দাবি করা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব অজিত কুমার ঘোষ। 

তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, উপ-সচিব পদে একজনও হিন্দু ব্যক্তি নেই। 

শিক্ষা

দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ দাবি যাচাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটিতে দাবি করা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব পতিত পাবন দেবনাথ ও সচিব অসীম কুমার কর্মকার। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব পদে কোনো হিন্দু ব্যক্তি নেই।

চতুর্দশ দাবি যাচাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটিতে দাবি করা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-প্রধান স্বপন কুমার ঘোষ।

কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম-প্রধান নামে কোনো পদ নেই। 

পঞ্চদশ, ষোড়শ ও সপ্তদশ দাবি যাচাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্যটিতে দাবি করা হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে কর্মরত আছেন যথাক্রমে  শ্রী বনমালী ভৌমিক, ড. অরুণা বিশ্বাস ও স্বপন কুমার সরকার। তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে কোনো হিন্দু ব্যক্তি নেই। 

অর্থাৎ, বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বে নিযুক্ত ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সম্প্রতি প্রচারিত তথ্যে উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গের মিল নেই। 

মূলত, শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন পদে হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিদের প্রাধান্য দাবি করে এই তথ্যটি ২০১৫ সালে প্রথম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করা হয়। তবে সেই সময়েরও বেশ কয়েকটি পদের সঙ্গের তথ্যটির অমিল খুঁজে পাওয়া যায়। এছাড়া তথ্যটিতে বেশ কিছু বানোয়াট পদের কথা উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া ২০১৫ সালের পর থেকে প্রায় প্রতিবছর এই তথ্যটি ফেসবুকে প্রচার হয়ে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতিও একই তথ্যটি প্রচার করা হচ্ছে। 

২০১৬ সালের কিছু পোস্ট দেখুন: এখানে, এখানে

২০১৭ সালের কিছু পোস্ট দেখুন: এখানে, এখানে

২০১৮ সালের কিছু পোস্ট দেখুন: এখানে, এখানে

২০১৯ সালের কিছু পোস্ট দেখুন: এখানে, এখানে

২০২০ সালের কিছু পোস্ট দেখুন: এখানে, এখানে

২০২১ সালের কিছু পোস্ট দেখুন: এখানে, এখানে

প্রসঙ্গত, গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদ অধিবেশনে জাতীয় পার্টি’র সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম পাঠ্যসূচিতে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কিত তথ্য বাদ দিয়ে হিন্দু ধর্ম সম্পর্কিত তথ্য যুক্ত করে পাঠ্যসূচীতে হিন্দুত্ববাদ আনা হয়েছে অভিযোগ তুলে একটি বক্তব্য দিয়েছেন। তার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের পুরাতন এই তথ্যটি নতুন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম গত ২ জুলাই সংসদে দেওয়া তার বক্তব্যকে প্রত্যাহারের জন্য সংসদের স্পীকার বরাবর আবেদন করেন।

ফখরুল ইমামের সংসদে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনও প্রকাশ করে রিউমর স্ক্যানার।

সুতরাং, শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন পদে হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিদের প্রাধান্য দাবি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচারিত তথ্যটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

DPE Website: Department of Primary Education 

NCTB Website: National Curriculum and Text Book

Technical Education Board Website: Technical Education Board

Technical and Madrasah Education Board: Technical and Madrasah Education Board

SESIP Website: SECONDARY EDUCATION SECTOR INVESTMENT PROGRAM (SESIP)

Dhaka Education Board Website: Dhaka Education Board 

Chattogram Education Board: Chattogram Education Board

secondary and Higher Education Division: Secondary and Higher Education Division

Secondary and Higher Education Division Officer list: Secondary and Higher Education Division Officer list

RS Team
RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img