তৃতীয় শ্রেণির ইসলাম শিক্ষা বইয়ে দুর্গার ছবি– গুজব নাকি সত্য?

তৃতীয় শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে দুর্গার ছবি থাকা নিয়ে ফেসবুকে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। নতুন বছরের প্রথম দিন উৎসবের মাধ্যমে বই বিতরণ হওয়ার পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয় যেখানে তৃতীয় শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ের মলাট বা প্রচ্ছদের ভিতর পার্শ্বে হিন্দু ধর্মের দেবী দুর্গার ছবি দেখা যায়। পরবর্তীতে ইসলাম শিক্ষা বইয়ে দুর্গার ছবি বিষয়টি ভাইরাল হয়ে যায় এবং ফেসবুকে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। 

অধিকাংশই বিষয়টি সত্য হিসেবে প্রচার করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইসলাম শিক্ষা বইয়ে দূর্গাপূজার মূর্তির ছবি থাকার বিষয়ে সমালোচনা করছে। আবার কেউ এটাকে গুজব বলে সমালোচনাকারীদের সমালোচনা করছে। অনেকে প্রমাণসহ তৃতীয় শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বই লাইভে দেখিয়ে দূর্গার ছবি থাকার বিষয়টিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও গুজব বলছে। কিছু ফেসবুক পেজ ও আইডি আরও একধাপ এগিয়ে বলছে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়ানোর জন্য তৃতীয় শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ের ছবি এডিট করে অনলাইনে গুজব ছড়ানো হচ্ছে।

এমতবস্থায় তৃতীয় শ্রেণির ইসলাম শিক্ষা বইয়ে দূর্গা পূজার প্রতিমার ছবি থাকার বিষয়টি গুজব নাকি সত্য তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। অনেকে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে যোগাযোগ করেছে আমাদের সাথেও, জানতে চেয়েছে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা? 

পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করেছে রিউমর স্ক্যানার। রিউমর স্ক্যানার টিম অনুসন্ধানে দেখেছে, তৃতীয় শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ের কভার পেজের ভিতরের পার্শ্বে দূর্গা প্রতিমার ছবি থাকার বিষয়টিকে যারা এডিটেড বা গুজব বলছে তাদের দাবি সত্য নয়। আবার ঢালাওভাবে যারা প্রাইমারির ইসলাম বইয়ে হিন্দু ধর্মের দেবী দুর্গার ছবি যুক্ত করা হয়েছে বলছে তাদের দাবিতেও রয়েছে বিভ্রান্তির সুযোগ। মূলত দুইটি জেলার কিছু স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে মুদ্রণজনিত ত্রুটির কারণে বইয়ের প্রচ্ছদ বা মলাটের উল্টো পাশে হিন্দু ধর্ম শিক্ষা বইয়ের ইংরেজি ভার্সনের মলাট মুদ্রিত রয়ে গেছে। এছাড়া অন্য কোনো জেলার তৃতীয় শ্রেণির ইসলাম শিক্ষা বইয়ে এ সমস্যা নেই৷ তাই ঐ দুই কিংবা একটি জেলার নির্দিষ্ট কিছু স্কুলের বই বাদে অন্য জেলার বই দেখে এ বিষয়টি যাচাই করে এটাকে গুজব বা এডিটেড বলারও সুযোগ নেই– যদিও অনেকে এমনটা করেছে। 

গত ৪ জানুয়ারি দৈনিক ইনকিলাব এর অনলাইন পোর্টালে “ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে দুর্গার ছবি” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘১ জানুয়ারি উৎসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে নতুন বই। তবে তৃতীয় শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে ঘটেছে কলঙ্কজনক ঘটনা। মুসলমান শিক্ষার্থীদের জন্য ছাপানো বেশকিছু বইয়ে পাওয়া গেছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দেবী দূর্গার ছবি। সাতক্ষীরার দুটি উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ও ঠাকুরগাঁওয়ের কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসব বই পাওয়ার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অভিভাবকরা। ঘটনা আচ করতে পেরে একদিন পরই শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বইগুলো ফিরিয়ে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তারা।’

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম ভূইয়া বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে ৫-১০টি স্কুলে এ ধরনের ভুল বই পাওয়ার খবর জেনেছি। এর পরপরই আমরা সেগুলো তুলে এনেছি। তবে বইয়ের সংখ্যা কত তা তাৎক্ষণিকভাবে বলতে পারছি না।’

এ বিষয়ে এনসিটিবি চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. ফরহাদুল ইসলাম বলেন, ‘এটা ছাপাখানার ভুল। ভুলটা হলো- ইসলাম শিক্ষা বইয়ের উল্টো পাশে হিন্দু ধর্ম শিক্ষা বইয়ের ইংরেজি ভার্সনের মলাট রয়ে গেছে। এটা জানার পরপরই আমরা বই তুলে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি। শুনেছি ৪০টি বইয়ে এমন ভুল হয়েছে। সাতক্ষীরার একটি স্কুলে এমন ভুল ছাপা বই পাওয়া গেছে। নতুন করে বই ছাপিয়ে দ্রুত শিক্ষার্থীদের বইটি দেওয়া হবে। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে জাগো নিউজের একটি প্রতিবেদনেও এনসিটিবি চেয়ারম্যানের অনুরূপ বক্তব্য পাওয়া যায়। জাগো নিউজকে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটা ছাপাখানার ভুল। ভুলটা হলো- ইসলাম শিক্ষা বইয়ের উল্টো পাশে হিন্দু ধর্ম শিক্ষা বইয়ের ইংরেজি ভার্সনের মলাট রয়ে গেছে। এটা জানার পরপরই আমরা বই তুলে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি। শুনেছি ৪০টি বইয়ে এমন ভুল হয়েছে। সাতক্ষীরার একটি স্কুলে এমন ভুল ছাপা বই পাওয়া গেছে। নতুন করে বই ছাপিয়ে দ্রুত শিক্ষার্থীদের বইটি দেওয়া হবে। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এছাড়া উক্ত বিষয়ে যুগান্তরের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, “নতুন শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকের তৃতীয় শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে (দুর্গা) প্রতিমার ছবি নিয়ে তোলপাড় চলছে। সোমবার বই উৎসব করে সাতক্ষীরা জেলায় ১ হাজার ৯৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই ধরনের বই বিতরণ করা হয়। বই বিতরণের কয়েক ঘণ্টা পরই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। 

বিষয়টি নিশ্চিত করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. ফরহাদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ঘটনা শোনার পরপরই সাতক্ষীরা স্থানীয় প্রশাসনকে স্কুল ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এসব বই তুলে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানায়, সরেজমিনে মঙ্গলবার শহরের টাউন সুলতানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ওই বিদ্যালয়ে ইসলাম ধর্মের সব বই জমা দিচ্ছেন বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। যারা আসতে কিংবা বই জমা দিতে দেরি করছে তাদেরকে মুঠোফোনে দ্রত বই জমা দেওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছেন দায়িত্বরত শিক্ষা কর্মকর্তারা।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তারা জানান, সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় তৃতীয় শ্রেণির মুসলিম শিক্ষার্থীদের ইসলাম ধর্মের ৮ হাজার ১৫০টি বই বিতরণ করা হয়েছে। আর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমরা সে বইগুলো পুনরায় সংগ্রহ করছি। এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম ভুইয়া চৌধুরী বলেন, প্রিন্টিং মিসটেকের কারণে বইগুলো তুলে নেওয়া হচ্ছে।” 

এ বিষয়ে প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়,  “সাতক্ষীরায় তৃতীয় শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার বই বিতরণের পর ৩১ হাজার ৪৭২টি বই ফেরত নেওয়া হয়েছে। ১ জানুয়ারি বই বিতরণ অনুষ্ঠানের কয়েক ঘণ্টা পর রাতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী কর্মকর্তা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তা ফেরত নিয়ে দ্রুত শিক্ষা অফিসে জমা দেওয়ার জন্য বলেন। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, তাঁরা জেনেছেন যে এ বইয়ের মলাটের (প্রচ্ছদ) ভেতরের পাতায় ও শেষ পাতার ভেতরে কিছু ভুল হয়েছে। তবে সব বইয়ে ভুল হয়নি। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুহা. আবদুল গণি বলেন, সদর উপজেলায় ৮ হাজার ১৫০টি বই বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে ২৩৩টি বইয়ের মলাটের ভেতরে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় এমন বিষয়বস্তু পাওয়া যায়।”

পরবর্তীতে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চেয়ে রিউমর স্ক্যানার এর পক্ষ থেকে এনসিটিবি চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. ফরহাদুল ইসলাম এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি আমাদের জানান, “এটি সাতক্ষীরায় গ্রামের একটি স্কুলে ৪০টি বইতে পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। সারা দেশে না হয়ে কেনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলো, বইগুলো এনসিটিবি এর কিনা ফরেনসিক টেস্ট করা হবে। তাছাড়া কিভাবে, কেনো হলো তা খুঁজে বের করা হবে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এটি নিয়ে কাজ চলছে।”

সুতরাং, সারাদেশের সকল জেলায় নয়, কেবল দুই জেলায় বিতরণ করা তৃতীয় শ্রেণির ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার প্রচ্ছদের ভিতর পার্শ্বে কিছু বইয়ে দুর্গা পূজার প্রতিমা সম্বলিত হিন্দু ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ের ইংরেজি ভার্সনের প্রচ্ছদ মুদ্রিত হয়ে থাকার ঘটনাটি সত্য। মুদ্রণজনিত ত্রুটির কারণে এমনটা হয়েছে বলে ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি এমন ভুল কেন হলো, কিভাবে হলো সে বিষয় নিয়েও কাজ চলছে।

RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img