সোমবার, সেপ্টেম্বর 26, 2022
spot_img

দৈনিক ৮ গ্লাস পানি কি সবার জন্য আবশ্যক?

সুস্বাস্থ্যের জন্য পানি পান অপরিহার্য। আপনি কি তা পর্যাপ্ত পরিমাণে পাচ্ছেন? আপনার দিনে কতটুকু পানি পান প্রয়োজন, দৈনিক ৮ গ্লাস? বেশি বেশি পানি পান কি শরীরের জন্য বেশি উপকার বয়ে আনে? আমরা এসব প্রশ্নের উত্তরই খুঁজবো এই প্রতিবেদনে।

তার আগে চলুন দেখি পানি পান করা নিয়ে মানুষের মধ্যে কি কি তথ্য প্রচলিত আছে-

তথ্যগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সবাই বলছে সারা দিনে ৮ থেকে ১২ গ্লাস পানি পান করতে। কিন্তু সুস্থ থাকতে ৮ থেকে ১২ গ্লাস পানি পান করা কতটুকু বিজ্ঞানসম্মত?

৮ থেকে ১২ গ্লাস পানি পান করার পরামর্শের উৎস কি?

এই তথ্যের উৎস অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘Myth of 8 Glasses of Water a Day‘ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

Screenshot from med.umich.edu

মার্কিন গণমাধ্যম New York Times এ ২০১৫ সালের ২৪ আগস্ট “No, You Do Not Have to Drink 8 Glasses of Water a Day” শীর্ষক শিরোনামে প্রচারিত একটি প্রতিবেদন থেকেও এই তথ্যের সত্যতা মিলে।

Screenshot from nytimes website

অর্থাৎ মানুষের শরীরে দৈনন্দিন যে পানি প্রয়োজন তা কেবল পানি থেকেই নয়, বরং তার গৃহীত অন্যান্য খাবার থেকেও দেহের পানির চাহিদা পূরণ করে। সেটার উৎস হতে পারে সবজী, ফলের রস, চা-কফি ও অন্যান্য যেকোনো পানীয়।

এছাড়া স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ক ওয়েবসাইট Healthline এ ২০২১ সালের ১২ অক্টোবর “Drink 8 Glasses of Water a Day: Fact or Fiction?” শীর্ষক শিরোনামে প্রচারিত একটি প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ৮ গ্লাস বা প্রায় ২ লিটার পরিমাণ পানি পানের নির্দেশনা কারো কারো জন্য অনেক বেশি আবার কারো জন্য পর্যাপ্ত না। সাধারণত সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মানুষের জন্য এত বিশাল পরিমাণে পানি পানের প্রয়োজনীয়তা পড়ে না। অপরদিকে পর্যাপ্ত পানি না পানের ফলে কেউ কেউ মৃদুমাত্রায় পানি স্বল্পতায় ভুগতে পারেন, পানিশূন্যতার কারণে দেহের ওজন ১-২ শতাংশ কমে যেতে পারে। এই পর্যায়ে যে কেউ মাথা ব্যথা, অবসাদের মতো বিভিন্ন সমস্যায় ভুগতে পারেন। কিন্তু এই পানিশূন্যতা পূরণে কাউকে মেপে মেপে ৮ গ্লাস পানিই পান করতে হবে না। 

একজন মানুষের কতটুকু পানি প্রয়োজন?

প্রতিদিন আমরা শ্বাস-প্রশ্বাস, ঘাম, মূত্রত্যাগ সহ নানাভাবে আমাদের দেহ থেকে পানি নিষ্কাশন করি। আর তাই শরীরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে আমাদেরকে পানি সমৃদ্ধ খাদ্য ও পানীয় পানের মাধ্যমে শরীরে পানির জোগান স্বাভাবিক রাখতে হয়।

তাহলে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের কতটুকু পানি প্রয়োজন? এমন প্রশ্নে আমেরিকার ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেডিসিন মানুষের পানি গ্রহণের একটি পরিমাপ ঠিক করে দিয়েছে।

Screenshot from mayoclinic website

প্রতিষ্ঠানটির মতে, একজন পুরুষের দিনে সাড়ে ১৫ কাপ বা ৩ দশমিক ৭ লিটার ও একজন নারীর সাড়ে ১১ কাপ বা ২ দশমিক ৭ লিটার তরল প্রয়োজন। যা পানি, অন্যান্য পানীয় ও খাদ্য থেকে মানুষ পেয়ে থাকে। প্রতিদিনকার প্রায় ২০ তরল সাধারণত খাবার থেকে আসে এবং বাকীটুকু আসে পানীয় থেকে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের Wayne State University এর সহযোগী অধ্যাপক তামারা হিউ-বাটলার মার্কিন গণমাধ্যম CNN কে বলেন, ব্যক্তি বিশেষে পানির চাহিদা নির্ভর করে ব্যক্তি আসলে কতটুকু পানি হারাচ্ছে তার উপর। মানুষের কতটুকু পানি প্রয়োজন তা মূলত তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যথা:

  • শারীরিক ওজন: বেশি ওজনের মানুষের বেশি পানি প্রয়োজন।
  • তাপমাত্রার রকমফের: যখন তাপমাত্রা বেশি থাকে, মানুষ তখন বেশি ঘামে ও শরীর থেকে তরল হারায়।
  • শারীরিক পরিশ্রমের মাত্রা: অতিরিক্ত পরিশ্রম শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি নিসৃত করে।

এগুলো ছাড়াও স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ক ওয়েবসাইট Healthline জানায়,

  • স্বাস্থ্য: যদি কেউ জ্বর বা অন্য কোনো রোগে ভুগে অথবা বমি, ডায়েরিয়ার মাধ্যমে শরীর থেকে তরল বেরিয়ে যায় তাহলে তাকে বেশি বেশি পানি পান করতে হবে। যদি ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা থাকে তাহলেও তাকে বেশি বেশি পানি পান করতে হবে। 
  • গর্ভধারণ অথবা দুগ্ধপান করানো: গর্ভবতী অথবা বাচ্চা লালনপালনকারী মায়েদের নিজেকে সতেজ রাখতে অতিরিক্ত পানি পান করতে হবে। 
  • খাবারের ধরণ: কেউ যদি প্রচুর কফি এবং অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পান করে তবে অতিরিক্ত প্রস্রাবের মাধ্যমে তিনি আরও পানি হারাতে পারেন অথবা খাবারের তালিকায় লবণাক্ত, মসলাযুক্ত বা চিনিযুক্ত খাবার বেশি থাকলেও বেশি পানি  পান করতে হবে। অথবা কেউ যদি প্রচুর পরিমাণে হাইড্রেটিং খাবার যেমন তাজা বা রান্না করা ফল এবং শাকসবজি না খায় তবে তারও অতিরিক্ত পানি পানের প্রয়োজন।

তবে এসব কারণে পানির চাহিদা পূরণে একই পরিমাপ সবার জন্য প্রযোজ্য না অর্থাৎ সকলের জন্য আট গ্লাস পানির পরামর্শ অনুপযুক্ত।

খাবার কিভাবে পানির চাহিদা পূরণ করে? 

মানুষের শরীরে দৈনন্দিন যে পানি প্রয়োজন তা কেবল পানি থেকেই নয়, বরং তার গৃহীত অন্যান্য খাবার থেকেও দেহের পানির চাহিদা পূরণ করে। সেটার উৎস হতে পারে সবজী, ফলের রস, চা-কফি, দুধ ও অন্যান্য যেকোনো পানীয়। আমরা যেসব খাবার খাই, সেসব খাবারে পর্যাপ্ত মাত্রায় পানি থাকে। একজন ব্যক্তি তার গৃহীত খাবার থেকে কতটুকু পানি পাবে তা নির্ভর করে মূলত কতটুকু পানি সমৃদ্ধ খাবার তিনি খাচ্ছেন

সবজী এবং বিভিন্ন ফল-ফলাদী বিশেষভাবে পানি সমৃদ্ধ খাবার এ চাহিদা পূরণ করে থাকে। এছাড়া মাংস, মাছ ও ডিমও প্রচুর পরিমাণে পানি সংরক্ষিত রাখে। তরমুজে পানির পরিমাণ ৯২ শতাংশ, ডিমে পানির পরিমাণ ৭৬ শতাংশ। এছাড়া বিভিন্ন পুষ্টিকর উপাদান হজম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেহের ভিতরও অল্প পরিমাণে পানি উৎপাদন হয়, যাকে মেটাবলিক ওয়াটার বলা হয়। সুতরাং যে সকল মানুষ খাদ্য থেকে পর্যাপ্ত পানি পায় না, তাদেরকে অন্যদের তুলনায় বেশি পরিমাণে পানি খেতে হবে।

কয়েকটি পানি সমৃদ্ধ খাবার- যা দেহের পানির চাহিদা পূরণ করতে পারে

এখানে বাংলাদেশে সহজলভ্য পানিসমৃদ্ধ কিছু ফল, সবজী ও খাবার নিয়ে আলোচনা করা হলো।

তরমুজ: পানির পরিমাণ ৯২%

গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশে সহজলভ্য একটি ফল তরমুজ। এটি একইসাথে স্বাস্থ্যকর ও পানিসমৃদ্ধ খাবার। ১৫৪ গ্রাম সমপরিমাণ তরমুজের মধ্যে ১১৮ মিলিলিটার পানি থাকে। পাশাপাশি কিছু আঁশ, ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, ম্যাগনেসিয়াম সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানও রয়েছে এই ফলে। আবার বেশি পরিমাণে পানি থাকায় তরমুজে ক্যালোরি ঘণত্বও কম। অর্থাৎ, বড় আকৃতির একটি তরমুজের বিপরীতে ক্যালোরি উপস্থিতি নগন্য। ফলে এটি ওজন কমানো সহ নানাভাবে স্বাস্থ্যের উপকার করে থাকে।

স্ট্রবেরি: পানির পরিমাণ ৯১%

তরমুজের মতো স্ট্রবেরিও উঁচুমাত্রায় পানি সমৃদ্ধ খাবার। স্ট্রবেরিতে পানির পরিমাণ প্রায় ৯১%। স্ট্রবেরি খাওয়ার মাধ্যমে যেকেউ তার প্রতিদিনের পানির চাহিদা পূরণ করতে পারে।

তরমুজের মতোই স্ট্রবেরিও অনেক আঁশ, রোগ প্রতিরোধক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন সি, ম্যাঙানিজ সহ অন্যান্য খনিজ সরবরাহ করে থাকে। ধারাবাহিক স্ট্রবেরি খাওয়ার মাধ্যমে প্রদাহ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা সহ বিভিন্ন প্রকার ক্যান্সার থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। 

কমলা: পানির পরিমাণ ৮৮%

একটি পুরো কমলা খেলে প্রায় আধা কাপ বা ১১৮ মিলিমিটার সমপরিমাণ পানি পাওয়া যায় এবং একইসাথে আঁশ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান তো সাথে আছেই। যার মধ্যে আছে ভিটামিন সি, পটাসিয়াম যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।

কমলায় থাকা পানি ও আঁশ মানুষকে পরিপূর্ণ সতেজতা প্রদান করে। যা প্রকৃতপক্ষে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি কমলা ও কমলাজাতীয় খাবারগুলো কিডনিতে পাথর জমা প্রতিরোধ করে। এছাড়া কিডনিতে পাথর জমা রোধ করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শরীরে যথাযথ পানির উপস্থিতি, যা কমলায় উঁচুমাত্রায় থাকা পানি দিয়ে থাকে।

শসা: পানির পরিমাণ ৯৫%

শসা, বাংলাদেশে বারো মাসেই পাওয়া যাওয়া একটি স্বাস্থ্যকর ও পানিসমৃদ্ধ খাবার। এটি পুরোটাই পানিসমৃদ্ধ এবং অল্পপরিমাণে পুষ্টিকর উপাদান যেমন ভিটামিন কে, পটাশিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়াম সরবরাহ করে থাকে। 

অন্যান্য পানিসমৃদ্ধ সব্জীর তুলনায় শসাতে ক্যালোরির পরিমাণ একদমই কম৷ অর্ধেক কাপ বা ৫২ গ্রাম শসাতে ক্যালোরির পরিমাণ মাত্র ৮। ফলে খাদ্যে খুব বেশি ক্যালোরি যোগ করা ছাড়াই বৃহৎ পরিমাণে শসা খাওয়া যায়, যা একইসাথে ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

স্যুপ: পানির পরিমাণ ৯২%

স্যুপ সাধারণত পানিসমৃদ্ধ খাবার এবং একইসাথে পুষ্টিকর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এক কাপ বা ২৪০ গ্রাম মুরগী স্যুপের প্রায় পুরোটাই পানির তৈরী। যা একজন মানুষের দৈনিক পানির চাহিদার বিশাল অংশ পূরণ করে দেয়। পাশাপাশি এ ধরনের খাবার ওজন কমানোতেও সহায়তা করে। 

সাধারণ দই: পানির পরিমাণ ৮৮%

সাধারণ দই বিপুল পরিমাণ পানি ও পুষ্টি উপাদান ধারণ করে, যা নানাভাবে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। এক কাপ বা ২৪৫ গ্রাম দইয়ের ৭৫ শতাংশই পানির তৈরি। এছাড়া সমপরিমাণ দইয়ে আছে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, পটাসিয়াম সহ বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ। 

দইয়ের এই পানির উপস্থিতি ও পুষ্টি উপাদানের কারণে প্রতিনিয়ত দই খাওয়া ক্ষুধামন্দা দূর করা ও ওজন কমাতে সহায়তা করে। তবে এজন্য বিভিন্ন ফ্লেভারযুক্ত দইয়ের পরিবর্তে সাধারণ দই খেতে হবে। কারণ, এসব দইয়ে বিভিন্ন ধরনের অস্বাস্থ্যকর উপাদান যেমন চিনি যুক্ত থাকে। যা স্থূলতা, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসে ভূমিকা রাখে।

যেমন ২৪৫ গ্রাম ফ্লেভারযুক্ত দইয়ে ৪৭ গ্রাম চিনি পাওয়া যায়, যা সমপরিমাণ সাধারণ দইয়ের চিনির উপস্থিতির ৪ গুণ।

টমেটো: পানির পরিমাণ ৯৪%

শীতকালীন সব্জী হলেও টমেটো এখন বাংলাদেশে বছর জুড়েই পাওয়া যায়। একটি মাঝারি টমেটোতে প্রায় অর্ধেক কাপ বা ১১৮ মিলিলিটার পানি পাওয়া যায়। পাশাপাশি এটি বৃহৎ পরিমাণে রোগ প্রতিরোধক ভিটামিন এ সহ অন্যান্য  ভিটামিন, খনিজ সরবরাহ করে থাকে। টমেটোতে পানির উচ্চ উপস্থিতির কারণে এটিতে ক্যালোরির পরিমাণ কম। এক কাপ সমপরিমাণ বা ১৪৯ গ্রাম টমেটোতে ৩২ ক্যালোরি পাওয়া যায়।

ফুলকপি: পানির পরিমাণ ৯২%

বাংলাদেশের শীতকালীন অন্যতম সবজী ফুলকপি। এটি অনেক পুষ্টিগুণ ও পানিসমৃদ্ধ। এক কাপ বা ১০০ গ্রাম ফুলকপি ৫৯ মিলিলিটারের বেশি পানি সরবরাহ করে থাকে। ফুলকপিতে পানির এই উচ্চমাত্রার উপস্থিতির কারণে এটিতে ক্যালোরির পরিমাণ কম। পাশাপাশি ফুলকপিতে ১৫ টি ভিন্ন ভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ থাকে। এর মধ্যে অন্যতম কোলিন, যা অনেক খাবারে পাওয়া যায় না। কোলিন হচ্ছে মস্তিষ্কের সুরক্ষা ও মেটাবলিজমের গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। 

বাধাকপি: পানির পরিমাণ ৯২%

বাংলাদেশের শীতকালীন আরেকটি সহজলভ্য সবজী বাধাকপি। এতে পানির পরিমাণ ৯২ শতাংশ। এর কারণে এতে ক্যালোরির পরিমাণ কম কিন্তু আঁশ ও পুষ্টি উপাদান অনেক বেশি। উদাহরণ স্বরূপ, বাধাকপিতে থাকা ভিটামিন সি প্রদাহ রোধ, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

কখন পানি পান করবেন?

মানব শরীর পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা পেতে এমনভাবে তৈরি করা যে, যখনই দেহে পানির প্রয়োজন হয় শরীর সেটা বুঝতে পারে। তাই আপনি যখন তৃষ্ণার্ত অনুভব করেন, তখনই পানি পান করুন। যদি উত্তপ্ত পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম করেন তাহলেও ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে যে পানিশূন্যতা তৈরি হয়, তা পূরণে অতিরিক্ত তরল পানীয় গ্রহণ করতে হবে।

পাশাপাশি পানির চাহিদা বুঝতে মূত্রের রঙও নির্দেশক হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া যায়। সাধারণত মূত্রের রঙ মৃদু বা হালকা হলুদ হয়। যদি এটা দেখতে পানির মতো হয়, তবে আপনি অতিরিক্ত পানি পান করছেন বিপরীতে যদি গাঢ় হলুদ বা কমলা রঙের হয় তাহলে বেশি পানি পান করতে হবে। 

একই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশন আরও যুক্ত করে বলে, একজন ব্যক্তির দৈনিক দেড় লিটার ( প্রায় ৬ কাপ) মূত্র উৎপাদন করা উচিত। 

কিভাবে বুঝবেন আপনি পর্যাপ্ত পানি পান করেছেন?

যখন আপনি কম তৃষ্ণা অনুভব করবেন, আপনার মূত্র রঙ বিহীন অথবা হালকা হলুদ রঙের হবে অথবা আপনার চিকিৎসক যখন আপনার দৈনন্দিন পানি পানের সীমা নির্ধারণ করে দিবে এবং আপনি সেটি অনুসরণ করেন। 

মোদ্দাকথা, পানিশূন্যতা এড়াতে ও শরীরে প্রয়োজনীয় পানির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পছন্দানুযায়ী পানীয় গ্রহণ করুন। 

সবচেয়ে ভালো হয় প্রত্যেকবার খাবারের আগে ও খাবারের মধ্যে এক গ্লাস করে পানি পান করার পাশাপাশি শরীর চর্চার সময় ও পরে তৃষ্ণাবোধ করলে পানি পান করা।

কিডনি ভালো রাখতে ৮ গ্লাস পানি !

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, আমাদের শরীরের ওজনের ৬০-৭০% শতাংশ পানি উপর তৈরি এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গই সঠিকভাবে তাদের কার্যক্রম চালাতে চায়। এক্ষেত্রে পানি মূত্র আকারে রক্ত থেকে দূষিত পদার্থ বের করে কিডনিকে ভালো রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি পানি রক্তনালীকে সচল রাখে। ফলে রক্ত সহজেই কিডনি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে এবং কিডনির প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান জোগান দিতে পারে। কিন্তু কেউ যখন জলশূন্য হয়ে যায়, তখন এটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কাজে বাধা প্রদান করে।

স্বল্পমাত্রায় পানিশূন্যতা মানুষকে ক্লান্ত করে দিতে পারে এবং দেহের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে অসম্পূর্ণ করে তুলতে পারে। আবার অতিরিক্ত পানি শূন্যতার কারণে কিডনিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই পর্যাপ্ত পানি পানের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে এই পর্যাপ্ত পানির পরিমাণ নিয়ে আগে থেকেই মানুষের মধ্যে একটা ভুল ধারণা আছে যে, প্রত্যেকে দিনে আট গ্লাস পানি পান করতে হবে। কিন্তু এটি ভুল। ব্যক্তি ও পরিবেশ ভেদে এই পানি গ্রহণের মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। আবার কেউ যখন কিডনি সমস্যায় ভোগেন, তার পক্ষে শরীর থেকে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব হয় না৷ এই ধরনের লোকেরা যখন ডায়ালাইসিস গ্রহণ করে, এই অবস্থায় পানি গ্রহণ নিষিদ্ধ।

প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি পান কি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর?

অতিরিক্ত পানি পানে স্বাস্থ্যবান এ সুস্থ মানুষের জন্য খুব কম সময়েই সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। খেলোয়াড়েরা সাধারণত দীর্ঘ সময় বা তীব্র অনুশীলনের সময় পানিশূন্যতা থেকে বাঁচতে অধিক পরিমাণে পানি পান করে থাকেন। তবে কেউ যখন এভাবে অতিরিক্ত পানি পান করলে তার কিডনি অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন করতে পারে না। ফলে শরীরের সোডিয়াম উপাদান দ্রবীভূত হয়ে যেতে পারে। যাকে হাইপোনেট্রেমিয়া (hyponatremia) বলা হয় এবং এটি জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

মূলত, প্রতিদিন ৮ গ্লাস পানি পান করা নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। কারণ, মানুষের পানির চাহিদা নির্ভর করে তার শারীরিক গঠন, পরিশ্রম, আবহাওয়া, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদির উপর। এছাড়া মানুষের পানির যে চাহিদা সেটা সরাসরি পানি ছাড়াও অন্যান্য তরল পানীয়, পানি সমৃদ্ধ খাবার থেকেও মানুষ গ্রহণ করে থাকে। মোদ্দাকথা, ব্যক্তি বিশেষে পানির চাহিদা নির্ভর করে ব্যক্তি আসলে কতটুকু পানি হারাচ্ছে তার উপর।

সুতরাং, মানুষের দিনে ৮ গ্লাস পানি পান করা আবশ্যক না বরং আমেরিকার ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড মেডিসিনের  মতে, একজন পুরুষের দিনে সাড়ে ১৫ কাপ বা ৩ দশমিক ৭ লিটার ও একজন নারীর সাড়ে ১১ কাপ বা ২ দশমিক ৭ লিটার তরল প্রয়োজন। যা পানি, অন্যান্য পানীয় ও খাদ্য থেকে মানুষ পেয়ে থাকে।

তথ্যসূত্র

RS Team
RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img