টাইমস র‍্যাঙ্কিংয়ে নর্থ সাউথ বাংলাদেশে দ্বিতীয় হয়নি, ঢাবির সঙ্গে যৌথভাবে প্রথম হয়েছে

সম্প্রতি, “টাইমস হায়ার র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সেরা ঢাবি, দ্বিতীয় নর্থ সাউথ!” শীর্ষক দাবিতে একটি তথ্য দেশীয় মূলধারার অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস, ঢাকা পোস্ট এবং বেশ কয়েকটি অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে।

গণমাধ্যমসহ কয়েকটি অনলাইনে পোর্টালে প্রচারিত প্রতিবেদনগুলো দেখুন; দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস, ঢাকা পোস্ট, সংবাদ, 7 College Pressবেকার জীবন

একই দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত প্রচারিত কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।পোস্টগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এবং এখানে

আলোচিত বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী জুলিয়াস সিজার তালুকদারের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে(আর্কাইভ)।

পোস্টে দাবি করা হয়, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই নাম্বার ওয়ান টাইমস্ হায়ার এডুকেশন র‌্যাংকিংয়ে। নর্থসাউথ প্রথম নয়।টাইমস্ হায়ার এডুকেশনের পর্যবেক্ষণে পাঠদান, গবেষণা, সাইটেশন, ইন্ডাস্ট্রি ইনকাম ও আন্তর্জাতিক আউটলুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কোর যথাক্রমে – ১৫.২, ৮.৬, ৮৫.৯, ৩৭.৩, ৪৩.১;  মোট=১৯০.১,
অন্যদিকে নর্থসাউথের  স্কোর যথাক্রমে- ১২.৭, ৯.৩, ৮৭.৮, ৩৬.৯, ৩৪.৮; মোট= ১৮১.৫। ৮.৬ নম্বর কম নিয়ে তারা যে চিৎকার করছে আর আনুষ্ঠানিকভাবে এই মিথ্যা অস্তিত্ব জাহির করছে তাতে বোঝাই যায়, তারা ভেতরে ভেতরে চরম হীনমন্যতায় ভুগছে।”

এছাড়া, দেশীয় মূলধারার গণমাধ্যম ‘সমকাল‘ এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘এবিনিউজ২৪‘ যথাক্রমে ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের সেরা ঢাবি’ এবং ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন র‍্যাংকিংয়ে দেশ সেরা ঢাবি’ শীর্ষক শিরোনামে সংবাদ প্রচার করেছে।

তাছাড়া, টাইমস র‍্যাঙ্কিংয়ে ঢাবি এবং নর্থ সাউথের অবস্থান সম্পর্কে আলোচিত বিতর্কের বিষয়টি নিয়ে আজ ২৩ অক্টোবর মূলধারার জাতীয় দৈনিক ‘কালবেলা’র প্রিন্ট সংস্করণের দ্বিতীয় পাতায়(আর্কাইভ) ‘ঢাবি না নর্থসাউথ শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিতর্ক’ শীর্ষক শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

উক্ত প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য(শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামালের একটি মন্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়।

অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, “র‍্যাঙ্কিংয়ে তালিকা ধরে হিসাব করলে ঢাবির অবস্থান ৬৪৯তম। এ দেশের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে সব বুদ্ধি-মুক্তির আন্দোলন, শিক্ষা-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের অনেক শিক্ষকের গবেষণা বিশ্ববিখ্যাত জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। উদযাপন না করে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায়, আমরা সেদিকে দৃষ্টি দিচ্ছি।”

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, টাইমস হায়ার এডুকেশনের ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিং ২০২৩- এ বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এককভাবে প্রথম স্থান অর্জন করেনি এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ও দ্বিতীয় স্থানে নয় বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় উভয়ই যৌথভাবে বাংলাদেশে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। এছাড়া টাইমসের তালিকায় “৬০১-৮০০” ক্রমধারায় যাদের দেখা যাচ্ছে তাদের স্থান দেওয়া হয়েছে ইংরেজি বর্ণমালা অনুযায়ী, কোনো র‌্যাঙ্কের ক্রমানুসারে নয়। তাই ‘টাইমসের তালিকা অনুযায়ী র‌্যাঙ্কিংয়ে ঢাবির অবস্থান ৬৪৯তম’ শীর্ষক দাবিটি সঠিক নয়।

অনুসন্ধানে টাইমস হায়ার এডুকেশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া তালিকায় দেখা যায়, র‌্যাংকিংয়ে ৬০১-৮০০ পর্যন্ত যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রাখা হয়েছে সেগুলোর জন্য নির্দিষ্ট কোনো র‌্যাঙ্ক ঠিক করা নেই। তবে তালিকায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নর্থ সাউথের আগে দেখা যাচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিং-২৩ এ বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাবি নাকি নর্থ সাউথ প্রথম এই বির্তক নিয়ে টাইম হায়ার এডুকেশনের একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করে রিউমর স্ক্যানার টিম।

টাইমস হায়ার এডুকেশনের ডাটা কালেকশন টিমের সদস্য জোয়ান্না কের বলেন, “৬০১-৮০০” ক্রমধারায় যাদের দেখা যাচ্ছে তাদের স্থান দেওয়া হয়েছে ইংরেজি বর্ণমালা অনুযায়ী। এখানে কেউ আগে বা কেউ পরে থাকা মানে র‌্যাঙ্ক আগে পরে নয়।

তিনি বলেন, এবছর বাংলাদেশ হতে মোট ৫ টি বিশ্ববিদ্যালয় ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিং ২০২৩-এ স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাঙ্কিংয়ে “৬০১-৮০০” ব্যান্ডে রয়েছে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে বাংলাদেশে প্রথম অবস্থান অর্জন করেছে।

এছাড়া তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা চাইলে র‍্যাঙ্কিংয়ের পাঁচটি সূচক অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্কোর তুলনা করতে পারেন।’

Word University Ranking – University of Dhaka
Word University Ranking – North South University

এক্ষেত্রে অবশ্য ৫ টি সূচকের (Teaching, Research, Citation, Industry Income, International Outlook) মধ্যে ঢাবি ৩ টি এবং নর্থ সাউথ ২টি এগিয়ে আছে। এবং সূচকগুলোর মোট পয়েন্ট হিসেব করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পয়েন্ট যথাক্রমে ১৯০.১ এবং ১৮১.৫।

সূচক এবং তালিকার ক্রমধারায় এগিয়ে থাকায় ঢাবিকে প্রথম এবং নর্থ সাউথ কে দ্বিতীয় বলা যাবে কী না? কি বলছে টাইমস হায়ার এডুকেশন কর্তৃপক্ষ

টাইমস হায়ার এডুকেশনের চিফ নলেজ অফিসার ফিল বাটি রিউমর স্ক্যানারকে জানিয়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় উভয় বিশ্ববিদ্যালয়কে র‌্যাঙ্কিংয়ে সমান অবস্থানে বিবেচনা করা উচিত। তারা যৌথভাবে একই ব্যান্ডে রয়েছে। ৬০১-৮০০ যারাই আছে সকলেই একই র‌্যাঙ্ক দাবি করতে পারবে। কারণ এখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থান দেওয়া হয়েছে ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুসারে, কোনো র‌্যাঙ্কের ক্রমানুসারে নয়।

মূলত, গত ১২ অক্টোবর যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’ কর্তৃক প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাঙ্কিংয়ে -২০২৩’ এ ‘৬০১-৮০০’ ক্রমের মধ্যে স্থান পেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। উক্ত র‌্যাঙ্কিংকে কেন্দ্র করে মূলধারার অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস ও ঢাকা পোস্ট ‘টাইমস হায়ার র‍্যাঙ্কিংয়ে সেরা ঢাবি, দ্বিতীয় নর্থ সাউথ’ শীর্ষক দাবিতে প্রতিবেদন প্রচার করেছে। তবে টাইমস হায়ার এডুকেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, র‍্যাঙ্কিংয়ে “ঢাবি ও নর্থ সাউথ উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ই একই ব্যান্ডে রয়েছে। তাই তারা উভয়ই যৌথভাবে বাংলাদেশে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। তালিকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের র‌্যাঙ্কের ক্রমানুসারে স্থান দেওয়া হয়নি, স্থান দেওয়া হয়েছে ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুসারে।

অর্থাৎ, যৌথভাবে ১ম উল্লেখ না করে টাইমের তালিকার ক্রমধারা বিবেচনা করে ঢাবিকে প্রথম এবং নর্থ সাউথকে দ্বিতীয় দাবি করে প্রচার করা হলে তা বিভ্রান্তিকর হবে। কারণ তালিকায় তাদের স্থান দেওয়া হয়েছে ইংরেজি বর্ণমালার ক্রম অনুযায়ী, র‌্যাঙ্কের ক্রম অনুযায়ী নয়। আর উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় দুটির কোনোটি যদি বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম বলে নিজেকে দাবি করে সেক্ষেত্রে সেটাও ভুল হবে, কারণ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে র‍্যাঙ্কিংয়ে যৌথভাবে ১ম হওয়া অন্য বিশ্ববিদ্যালয়টিও রয়েছে।

তথ্যসূত্র

RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img