রবিবার, জুলাই 21, 2024
spot_img

ফিলিস্তিন নিয়ে ক্যাম্পেইন শুরুর পর মোজোর ৫০০ মিলি বোতলের দাম বাড়েনি 

গত বছরের (২০২৩) ০৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলে ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’ নামে হামলা শুরু করে। এই হামলা কেন্দ্র করে ইসরায়েল-হামাস সংঘাত শুরু হয়, যা এখনো চলছে। সংঘাতের মধ্যেই ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে এই সংঘাত সংক্রান্ত নানা তথ্য আসছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গাজায় ত্রাণ এবং অর্থ সহায়তাও পাঠানো হচ্ছে। দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কোমল পানীয় মোজোর পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিক্রয়কৃত মোজোর প্রতিটি বোতল থেকে ১ টাকা যাবে ফিলিস্তিনের সহায়তায়। এই ক্যাম্পেইন শুরুর পরবর্তী সময়ে ক্রেতাদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলে আকিজ ফুড এন্ড বেভারেজের এই পণ্য। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোজোর ৫০০ মিলিলিটারের একটি বোতলের ছবি প্রকাশ করে দাবি করা হচ্ছে, মোজো তাদের ১ টাকা ডোনেশান ক্যাম্পেইন শুরু করার পর মোজোর দাম ১০ টাকা বাড়িয়েছে। বলা হচ্ছে, ২৫ টাকার মোজো এই সময়ে হয়েছে ৩৫ টাকা।

ফেসবুকে ছড়িয়ে এ সংক্রান্ত পোস্টগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে, “ছবি দেখে মনে হচ্ছে মোজো ৫০ টাকা দাম কমিয়ে ৩৫ টাকা করসে। আদতে মোজো কোনদিন ৫০ টাকা ছিলই না। মোজো ছিল ২৫ টাকা। কোকের উপর গোস্বা করার পর মোজো ১ টাকা ডোনেশান ক্যাম্পেইন শুরু করে। কিন্তু ১ টাকা ডোনেশনের বিপরীতে মোজোর দাম বাড়িয়ে দেয় ১০ টাকা। ২৫ টাকার মোজো হয়ে যায় ৩৫ টাকা।  (যেহেতু মানুষ কোনদিন মোজো খাইতই না, সো তারা এই লেবেল দেখে ভাবসে মোজো ৫০ টাকা ছিল)।” 

উক্ত দাবি সম্বলিত ফেসবুকের কিছু পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ)। 

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, মোজোর ৫০০ মিলি বোতলের দাম কখনো ৫০ টাকা না থাকলেও ফিলিস্তিনের বিষয়ে ক্যাম্পেইন শুরুর পর পণ্যটির দাম ১০ টাকা বাড়ানোর দাবি সঠিক নয় বরং গত ডিসেম্বরে এ সংক্রান্ত ক্যাম্পেইন শুরুর আগে গত জুনে সর্বশেষ ৫০০ মিলি বোতলের দাম ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হয়। 

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে মোজোর উৎপাদনকারী মূল প্রতিষ্ঠান আকিজ ভেঞ্চারের ওয়েবসাইটে গত বছরের (২০২৩) ০৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যাচ্ছে, গত বছরের (২০২৩) ২৪ নভেম্বর ঢাকার হাতিরঝিলে আয়োজিত ‘To Gaza From Dhaka’ নামে একটি ফান্ডরেইজিং কনসার্টে মোজো ‘Mojo Support Palestine’ নামে একটি ক্যাম্পেইন শুরুর ঘোষণা দেয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মোজোর প্রতি বোতলের আয় থেকে এক টাকা ফিলিস্তিনের সহায়তায় পাঠানো হবে। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দিনই মোজোর ফেসবুক পেজেও বিষয়টি জানানো হয়। 

আকিজ ফুড এন্ড বেভারেজের ব্র্যান্ড ম্যানেজার আদনান শফিক রিউমর স্ক্যানারকে জানিয়েছেন, তারা ০৪ ডিসেম্বর থেকে এই ক্যাম্পেইন শুরু করেন। 

রিউমর স্ক্যানার অনুসন্ধানে দেখেছে, গত বছরের অক্টোবরেও একই লেভেলে (৫০ টাকার পরিবর্তে ৩৫ টাকা) মোজোর ৫০০ মিলির বোতল বাজারে ছিল। 

Screenshot: Facebook 

আগস্টের এক ফেসবুক পোস্টেও সেসময় মোজোর দাম ৩৫ টাকা থাকার বিষয়ে জানা যাচ্ছে। তবে সেপ্টেম্বরে অনলাইনে পণ্য বেচাকেনার একটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের আর্কাইভ থেকে দেখা যায়, সেসময় তারা ৩০ টাকায় মোজোর ৫০০ মিলির বোতল বিক্রি করছিল। যদিও অনলাইনের এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই কোনো না কোনো অফার চলে। তাই দামের হেরফের হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আদনান শফিকও আমাদের এমনটাই বলছেন৷ তার মতে, “ই-কমার্স ব্যবসায় উনারা কিছু কম রাখে। এটা বেশিরভাগ পণ্যের ক্ষেত্রেই। এক্ষেত্রে ব্র্যান্ড কিছু ছাড় দেয়, ই-কমার্স সাইট থেকে কিছু ছাড় দেয়। আবার এমনও হয় তারা তথ্য আপডেট করতেও সময় নেয়।”

আদনান বলছেন, কো-ব্রান্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও দামের এমন ভিন্নতা হয়। যেমন স্পা পানির বোতল স্থানীয় বাজারে এক দাম, আবার হোটেল রেডিসন ব্লুতে বেশি দাম। 

অর্থাৎ, সাম্প্রতিক সময়ে মোজোর যে বোতলের লেভেল দেখিয়ে দাবি করা হচ্ছে, গত ডিসেম্বর বা পরবর্তী সময়ে মোজোর ৫০০ মিলির বোতলের দাম ২৫ থেকে ৩৫ টাকা হয়েছে তা সঠিক নয়। কারণ, গত বছরের (২০২৩) আগস্টেও একই দামেই মোজো বিক্রি হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। 

আমরা আদনান শফিকের কাছে জানতে চেয়েছিলাম মোজোর ৫০০ মিলির বোতলের দাম সর্বশেষ কবে বেড়েছে। তিনি বলেছেন, “কাঁচা মালের দাম বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মোজো ৫০০ মিলি বোতলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩৫ টাকা করা হয় ২০২৩ সালের জুন মাসে।”

আমরা অবশ্য গত জুলাইতেও একটি ফেসবুক পোস্টে ৩০ টাকায় মোজো বিক্রি হতে দেখেছি। তবে এই বোতলের লট ৩০ মে অর্থাৎ জুনে দাম বৃদ্ধির পূর্বেই উৎপাদিত হয়েছিল যা মোড়কে থাকা উৎপাদনের তারিখ থেকে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। পরবর্তীতে জুলাই এর আরেকটি পোস্ট থেকে হাফ লিটার মোজোর দাম ৩৫ টাকা থাকার বিষয়ে জানা যায়। 

আদনান নিজেও রিউমর স্ক্যানারকে বলেছেন, “মোজো সাপোর্ট ফিলিস্তিন এই ক্যাম্পেইন চলাকালীন এখন পযর্ন্ত মোজো পি ই টি বোতলের কোন দাম বাড়ানো হয় নাই, দাম বাড়ানো নিয়ে ভুল ইনফরমেশন ছড়ানো হচ্ছে।”

মোজোর ৫০০ মিলির দাম কি ৫০ টাকা ছিল?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত পোস্টগুলোতে মোজোর ৫০০ মিলি বোতলের দাম ৫০ টাকা কেটে ৩৫ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনাব আদনান বলেছেন, “মোজো ৫০০ মিলি বোতলের লেবেল এ ৫০ টাকা কেটে যে ৩৫ টাকা লেখা আছে এর অর্থ বাজারে কোলাপানীয় ৫০০ মিলি প্রোডাক্টের দাম ৫০ টাকা সেখানে মোজো অফার করছে ৩৫ টাকা। যেটি একটি ব্যবসায়িক কৌশলমাত্র, এখানে ৫০০ মিলি কোলা ক্যাটাগরি প্রোডাক্ট এর মার্কেট প্রাইস এবং মোজো ৫০০ মিলি অফার প্রাইস বিষয়টি দেখানো হয়েছে যার মাধ্যমে ভোক্তাসাধারণ যাতে ভ্যালু ফর মানি বা প্রাইস বেনিফিট বিষয়টি বুঝতে পারে । তারপর সেই ভোক্তা যেই পণ্যটিই ক্রয় করুক এটা তার নিতান্তই নিজস্ব ব্যাপার।”

অর্থাৎ, মোজোর ৫০০ মিলির দাম ৫০ টাকা ছিল না। অন্যান্য কোমল পানীয় এর দামের সাথে তুলনা দেখাতে এই ব্যবসায়িক কৌশল ব্যবহার করেছে মোজো কর্তৃপক্ষ। 

মূলত, গত বছরের (২০২৩) ০৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ইসরায়েলে ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’ নামে হামলা শুরু করে। এই হামলা কেন্দ্র করে ইসরায়েল-হামাস সংঘাত শুরু হয়, যা এখনো চলছে। এই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গাজায় ত্রাণ এবং অর্থ সহায়তাও পাঠানো হচ্ছে। দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কোমল পানীয় মোজোর পক্ষ থেকেও জানানো হয়, বিক্রয়কৃত মোজোর প্রতিটি বোতল থেকে ১ টাকা যাবে ফিলিস্তিনের সহায়তায়। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোজোর ৫০০ মিলিলিটারের একটি বোতলের ছবি প্রকাশ করে দাবি করা হচ্ছে, মোজো কোনোদিন ৫০ টাকা ছিলই না। মোজো তাদের ১ টাকা ডোনেশান ক্যাম্পেইন শুরু করার পর মোজোর দাম ১০ টাকা বাড়িয়ে ২৫ টাকা থেকে ৩৫ টাকা করেছে। কিন্তু রিউমর স্ক্যানার টিম অনুসন্ধানে জেনেছে, মোজোর ৫০০ মিলি বোতলের দাম কখনো ৫০ টাকা না থাকলেও ফিলিস্তিনের বিষয়ে ক্যাম্পেইন শুরুর পর পণ্যটির দাম ১০ টাকা বাড়ানোর দাবি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, গত ডিসেম্বরে এ সংক্রান্ত ক্যাম্পেইন শুরুর আগে গত জুনে সর্বশেষ ৫০০ মিলি বোতলের দাম ৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হয়। এরপর আর মোজোর দাম বাড়েনি। 

সুতরাং, মোজোর ৫০০ মিলি বোতলের দাম কখনো ৫০ টাকা না থাকলেও ফিলিস্তিনের বিষয়ে ক্যাম্পেইন শুরুর পর বোতলটির দাম ১০ টাকা বাড়ানোর ভুল দাবি ইন্টারনেটে প্রচার করা হচ্ছে; যা বিভ্রান্তিকর। 

তথ্যসূত্র

  • Akij Venture: Mojo Support Palestine
  • Statement from Adnan Shafiq, Akij Food & Beverage Limited
  • Rumor Scanner’s own analysis 
RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img