শুক্রবার, মে 24, 2024
spot_img

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কালো তালিকাভুক্ত হয়েছে দাবিতে গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যটি মিথ্যা

সম্প্রতি, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি ফর দ্যা ক্রিয়েটিভ আর্টস (ইউসিএ) বাংলাদেশের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করেছে বলে দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রচার করা হয়েছে। 

সেসব প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘কালো তালিকাভুক্ত’ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে একমাত্র কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রয়েছে৷ এ সংক্রান্ত কিছু প্রতিবেদন দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে

এসব প্রতিবেদনের জেরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানেএখানেএখানে। 

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি ফর দ্যা ক্রিয়েটিভ আর্টস (ইউসিএ) কর্তৃক কালো তালিকাভুক্ত নয় বরং কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই উক্ত তথ্যটি গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে।

গুজবের উৎপত্তি

গত ১৫ এপ্রিল ‘এসএ এক্সপ্রেস’ নামের একটি ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সংস্থার বরাতে ‘2A news’ নামের যুক্তরাজ্যের কমিউনিটি ভিত্তিক একটি আইপিটিভির ফেসবুক পেজে প্রচারিত এক ভিজ্যুয়াল প্রতিবেদনে বলা হয় বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়কে কালো তালিকাভুক্ত করেছে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি ফর দ্যা ক্রিয়েটিভ আর্টস (ইউসিএ)। 

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ঐ ৫টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যের এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবেন না। যদিও পরে 2A News এর ফেসবুক পেইজ থেকে প্রতিবেদনটি সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে ফেসবুকে এখনো উক্ত ভিডিও প্রতিবেদনটি পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিবেদনটি দেখুন এখানে৷

এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ পরবর্তী সময়ে ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সংস্থা ‘এসএ এক্সপ্রেস’ এর সূত্র ধরে দেশীয় বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম প্রায় একই সংবাদটি প্রচার করে৷ এর মধ্যে বেসরকারি ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম একাত্তর টিভি ও চ্যানেল ২৪ অন্যতম। 

তবে পরবর্তীতে চ্যানেল দুইটিই সংবাদটি সরিয়ে নিলেও একাত্তর টিভির লন্ডন প্রতিনিধি তানভীর আহমেদ এর ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেলে একাত্তর টিভির প্রতিবেদনটির এখনো অস্তিত্ব রয়েছে। প্রতিবেদনটির আর্কাইভ দেখুন এখানে। 

সংবাদ দুইটি ফেসবুকে এখনো পাওয়া যাচ্ছে। সংবাদ দুইটি দেখুন এখানে, এখানে। এছাড়া কুমিল্লার বহুল প্রচলিত আঞ্চলিক দৈনিক ‘কুমিল্লার কাগজ‘ও তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ হতে উক্ত সংবাদটি প্রচার করেছে।

গণমাধ্যমগুলোতে উক্ত সংবাদ প্রচারের পর উক্ত সংবাদকে মিথ্যা দাবি করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি

এছাড়া ঢাকায় অবস্থিত দ্যা ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা নামের একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সাথে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি নাম (Comilla University) মিলে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় হয়রানির শিকার হয়েছে বলে গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। এমন কিছু সংবাদ দেখুন এখানে, এখানে। 

এদিকে দ্যা ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লাকে কালো তালিকাভুক্ত করে ২০১৯ সালের জুনের ১৩ তারিখ গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এছাড়া চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল ইউজিসি এই গণবিজ্ঞপ্তিটি পুনরায় নবায়ন করে। 

নাম বিভ্রাট ও ইউসিএ’র কালো তালিকাভুক্তির ব্যাপারে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক বিশ্বজিৎ চন্দ্র চ্যানেল২৪কে বলেন, “মূলত নামের বিভ্রান্তির কারণেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এই তালিকায় ঢুকতে পারে। একই নামের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণেই এই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।”

অপরদিকে 2A News তাদের ভিজ্যুয়াল প্রতিবেদনে যে ডকুমেন্টটিকে প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছে, তার একটি কপি রিউমর স্ক্যানারের হাতে এসেছে৷ 

এই কপিটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে কোথাও ‘কালো তালিকাভুক্ত’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি৷ বরং এর পরিবর্তে লেখা রয়েছে ‘নট একসেপ্ট’। 

পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে ইউসিএতে যে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়াম অব ইনস্ট্রাকশন (এমওআই) গ্রহণ করা হবে বলে তালিকা দেওয়া হয়েছে, সেখানেও বেশকিছু অসংগতি দেখা গিয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে ৩২ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমওআই গ্রহণ করা হবে মর্মে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও সে তালিকায় আহসান উল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র‍্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দুইবার করে এসেছে। আবার ঢাকার বাইরের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নামও এই তালিকায় নেই।

তবে এর পরই বেসরকারি সংবাদ চ্যানেল একাত্তর টিভিতে আরও একটি প্রতিবেদন করা হয়। যেখানে অনুসন্ধানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে কালো তালিকাভুক্ত করার সত্যতা দাবি করা হয়৷

কিন্তু রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে এই প্রতিবেদনটিতে বেশ কিছু অসংগতির দেখা মিলে৷ এর মধ্যে রয়েছে, ঐ প্রতিবেদনটির প্রতিবেদকের ইউনিভার্সিটি ফর দ্যা ক্রিয়েটিভ আর্টসের কোনো দায়িত্বশীলের সঙ্গে কথা না বলা। কুমিল্লা জেলার ইংরেজি নামের বানান (Cumilla) করা হলেও কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের ইংরেজি বানান (Comilla) এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করতেও শোনা যায় প্রতিবেদককে। কারণ, দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৬ নামে একটি নিজস্ব আইনে চলে৷ যেখানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি নামের বানান (Comilla University) হিসেবে এখনো বলবৎ রয়েছে। 

পাশাপাশি প্রতিবেদনটিতে মিডিয়াম অব ইনস্ট্রাকশন (এমওআই) নিয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনটির দাবি অনুযায়ী, কথিত তালিকাটিতে উল্লিখিত ৩৩টি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় ইউসিএতে কালো তালিকাভুক্ত। 

এছাড়া ইউনিভার্সিটি ফর দ্যা ক্রিয়েটিভ আর্টস (ইউসিএ) এর ওয়েবসাইট ঘুরে দেখা গেছে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির কিছু শর্ত উল্লেখ আছে। 

সেখানে উল্লেখ আছে নর্থ সাউথ, ব্র‍্যাক, আইইউবি, ইস্ট ওয়েস্ট, এআইইউবি, বিইউপিসহ ইউজিসি অনুমোদিত যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তারা বিবেচনা করে থাকে। 

এদিকে কালো তালিকাভুক্ত নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের সত্যতা জানতে চেয়ে ইউসিএ কর্তৃপক্ষকে পাঠানো মেইলের জবাব হিসেবে গত ৩০ মে সোমবার রাত পৌনে ১০টা ০৫ মিনিটে ইউসিএ থেকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈনের কাছে একটি ই-মেইল করা হয়৷ 

ইউসিএ’র প্রেসিডেন্ট ও ভাইস চ্যান্সেলর’স প্রজেক্ট অ্যান্ড অপারেশনাল সাপোর্ট অফিসার লিনা জর্নের নামে পাঠানো এই ই-মেইলে বলা হয়, 

‘ইউনিভার্সিটি ফর দ্যা ক্রিয়েটিভ আর্টস’র নিয়োগ এবং ভর্তি বিভাগ নিশ্চিতকরণ করেছে যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে তারা কখনো কালো তালিকাভুক্ত করেনি বরং বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়াশোনার ক্ষেত্রে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।’

দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে এভাবে ভুয়া সংবাদ প্রচার ও সেটি প্রমাণিত হওয়ার বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এফ এম আবদুল মঈন রিউমর স্ক্যানারকে বলেন, ‘কিছু মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় আমাদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে। সময় ব্যয় করতে হয়েছে। তবে আল্টিমেটলি সত্য কখনই গোপন থাকে না। ফেইক জার্নালিজম কখনো জয়ী হয় না।’

পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে এই বিষয়ে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও দিয়েছে৷ 

মূলত, কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র ছাড়াই একটি ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সংস্থার বরাতে যুক্তরাজ্যের কমিউনিটিভিত্তিক আইপিটিভিসহ দেশীয় মূলধারার ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম ‘একাত্তর টিভি’ ও ‘চ্যানেল২৪’ এবং ‘কুমিল্লার কাগজ’ এ যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি ফর দ্যা ক্রিয়েটিভ আর্টস কর্তৃক বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে দাবি করে সংবাদ প্রচার করা হলেও যুক্তরাজ্যের ঐ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক ইমেইল বার্তার মাধ্যমে উক্ত সংবাদটি সত্য নয় বলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে নিশ্চিত করেছেন।

উল্লেখ্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৬ সালের ২৮ মে দেশের ২৬ তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয় এর এক বছর পর অর্থাৎ ২০০৭ সালের ২৮ মে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছয়টি অনুষদের অধীনে ১৯টি বিভাগে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকাল হতে এ পর্যন্ত কখনো বিশ্ববিদ্যালয়টির বিরুদ্ধে সনদ বিক্রির কোনো অভিযোগ দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো সংবাদমাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায় নি।

প্রসঙ্গত, যুক্তরাজ্যের যে বিশ্ববিদ্যালয়টি (ইউনিভার্সিটি ফর দ্যা ক্রিয়েটিভ আর্টস) কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে কালো তালিকাভুক্ত করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে খোদ সেই বিশ্ববিদ্যালয়টিতেই (ইউনিভার্সিটি ফর দ্যা ক্রিয়েটিভ আর্টস) বর্তমানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী উচ্চতর ডিগ্রির জন্য অধ্যয়নরত রয়েছেন। ২০২১-২২ সেশনে ইউসিএতে গ্লোবাল মাস্টার অফ বিজনেস এণ্ড ম্যানেজমেন্টে অধ্যায়নরত বাংলাদেশের সিলেটের সন্তান মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল খান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগ হতে ২০১৩-১৪ সেশনে অনার্স এবং ২০১৭-১৮ সেশনে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। আব্দুল আউয়ালের ইউসিএতে ভর্তির পূর্বে প্রাপ্ত অফার লেটারের সফট কপিটি রিউমর স্ক্যানারের হাতে এসেছে।

কুমিল্লা

সুতরাং, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি ফর দ্যা ক্রিয়েটিভ আর্টস কর্তৃক বাংলাদেশের অন্যতম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করা হয়েছে দাবিতে গণমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যটি সম্পূর্ণ গুজব ও বানোয়াট।

তথ্যসূত্র

RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img