বুধবার, ফেব্রুয়ারি 28, 2024
spot_img

১২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট জ্বর নিয়ে কি মানুষ বাঁচতে পারে?

জ্বর আলাদা কোনো রোগ নয়, এটি অন্য রোগের উপসর্গ। শরীরের তাপমাত্রা যখন স্বাভাবীকের থেকে বেশি হয় তখন তাকে জ্বর বলা হয়। জ্বর হচ্ছে শরীরে যেকোনো ধরণের সংক্রমণ বা প্রদাহের সংকেত। জ্বর অনেক কারণে হতে পারে যেমনঃ সাধারণত ঋতু বা আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে ভাইরাস জনিত জ্বরই বেশি দেখা যায়। এছাড়াও, ঠান্ডা লাগলে, পেটে সংক্রমণ হলে বা ফুসফুসে ইনফেকশন হলে জ্বর দেখা দিতে পারে। আবার কিছু জটিল রোগের কারণে জ্বর হতে পারে। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জ্বর সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর কিছু পোস্ট 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবু্কে গত ২৮ এপ্রিল বেলা বোস নামক পেজ থেকে একটি পোস্ট (আর্কাইভ) করা হয়। পোস্টটির ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়, “১২০ ডিগ্রি জ্বর নিয়েও যেই মেয়েটা তোমাকে মেসেজ দিয়ে তুমি কেমন আছো জানতে চায়,তাকে কষ্ট দেওয়ার অধিকার তোমার নেই!

একইরকম ফেসবুকের আরো কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে। পোস্টগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে

তাপমাত্রা পরিমাপের প্রক্রিয়া

ডিজিটাল থার্মোমিটার, এবং ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দিয়ে শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করা যায়। ডিজিটাল থার্মোমিটার সহজেই পাওয়া যায় এবং এর মাধ্যমে শরীরের সঠিক তাপমাত্রা নির্ণয় করা যায়। একজন ব্যক্তির শরীরের বিভিন্ন অংশে এটি ব্যবহার করা যায় যেমনঃ মলদ্বার, বগল এবং মুখ। ইনফ্রারেড থার্মোমিটার দিয়ে দূর থেকে শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করা যায়। 

মানুষের শরীরের স্বাভাবীক তাপমাত্রা 

মুখের মধ্যে ৯৯.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট মলদ্বারের ১০০.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট আন্ডারআর্ম বা বগলে ৯৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হচ্ছে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা। গড়ে মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা হল ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। মানুষের বয়স, লিঙ্গ, দিনের সময় এবং কার্যকলাপের স্তর সহ বেশ কয়েকটি কারণ দ্বারা মানুষের শরীরের তাপমাত্রা প্রভাবিত হতে পারে। জার্মান পদার্থবিদ Carl Reinhold August ১৮৬৮ সালে সর্বপ্রথম মানবদেহের স্বাভাবিক গড় তাপমাত্রা ৯৮.৬ ডিগ্রি বলে নির্ধারণ করেন।

বয়স অনুযায়ী মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রাঃ 

গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরের তাপমাত্রাঃ 

গর্ভাবস্থায়, একজন নারীর বেসাল মেটাবলিক রেট (BMR) বেশি থাকে। এর ফলে তার শরীর বেশি তাপ উৎপন্ন করে। গর্ভাবস্থার ১২ তম সপ্তাহে শরীরের তাপমাত্রা  শীর্ষে থাকে। তখন তাপমাত্রা ৯৬-৯৯.৫ ডিগ্রি  ফারেনহাইট (৩৫.৬-৩৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) থাকে। 

জ্বর কখন হয়

মুখে বা বগলের তাপমাত্রা যদি ৯৯.৭ ডিগ্রি ধরা পড়ে তাহলে তা জ্বর হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে মলদ্বারের মাধ্যমে মাপা তাপমাত্রা শিশুদের বেলায় হতে হবে ১০০.৪ ডিগ্রি আর বয়স্কদের বেলায় হতে হবে ১০০.৬ ডিগ্রি।

মানুষের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরা হয় ৯৮.৬ ডিগ্রি। এর থেকে তাপমাত্রা বেশি হলে জ্বর হয়েছে বলে ধরা হয়। কিন্তু ২০২০ সালের এক গবেষণায় বলা হচ্ছে যে ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস মানুষের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নয়। এই পরিমাপ এখন পরিবর্তিত হয়েছে কারণ, এক শতাব্দীর ব্যবধানে মানুষের শরীরের গড় স্বাভাবিক তাপমাত্রা অন্তত এক ডিগ্রি কমেছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের The National Center for Biotechnology Information এর তথ্য অনুযায়ী, শরীরের তাপমাত্রা ১০০.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বা তার বেশি হলে জ্বর বলে মনে করা হয়। ১০৩. ১ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এর বেশি তাপমাত্রাকে উচ্চ জ্বর বলে মনে করা হয় এবং ১০৫.৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এর উপরে তাপমাত্রা উঠে গেলে তাকে তীব্র জ্বর হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। 

বর্তমানে মানব শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা

যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অব মেডিসিন’ নতুন গবেষণায় জানিয়েছে, ১৬০ বছর বা তার কিছু বেশি সময় আগে মানবদেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা যা ছিল তা আর বহাল নেই। দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা কমে গিয়েছে ১ ডিগ্রি ফারেনহাইটেরও বেশি। ফলে জ্বর মাপার সময় থার্মোমিটারে যে তাপমাত্রাকে (৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট) স্বাভাবিক ধরা হত, তা আর স্বাভাবিক নয়। বর্তমানে এই সংখ্যা এখন ৯৭. ৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট। 

দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা কমে গেছে ১ ডিগ্রি ফারেনহাইটেরও বেশি। ফলে জ্বর মাপার সময় থার্মোমিটারে যে তাপমাত্রাকে (৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট) স্বাভাবিক ধরা হয়, তা এখন আর স্বাভাবিক নয়। এটি এখন ৯৭. ৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট। 

দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণ  

কখনো খুব সাধারণ কারণেও জ্বর হতে পারে, আবার কখনো কোনো জটিল রোগের কারণে যেমনঃ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার, মস্তিষ্কের প্রদাহ, টাইফয়েড, রক্তনালির প্রদাহ, একজিমা, সেলুলাইটিস, এসএলই, আইটিপি ইত্যাদি কারণে হতে পারে। এটি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার মতো জীবাণুর প্রতিক্রিয়ার কারণেও হতে পারে। এছাড়াও, আমাদের শরীর জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন তৈরি করে, ফলেও শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। মহামারি করোনারও অন্যতম প্রধান উপসর্গ হচ্ছে জ্বর। তবে, কেবল মাত্র শরীরের অভ্যন্তরীণ জটিলতার কারণেই জ্বর হয়না, এটি শারীরবৃত্তীয় চাপের ফলেও হতে পারে, যেমন কঠোর ব্যায়াম এবং পরিবেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে হিট স্ট্রোক থেকেও হতে পারে।  তাই জ্বর হলে শুরু থেকেই সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

জ্বর যখন ভয়ের কারণ নয়

শরীরের ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা কোনো চুড়ান্ত সংখ্যা নয়। এটা মূলত একটি গড় হিসাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স্ক মানুষদের দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮.৬ ডিগ্রির চেয়েও কম হতে পারে। আর শ্রমজীবিদের দেহের তাপমাত্রা এর চেয়ে একটু বেশিও থাকতে পারে। তখন যদি ওজন কমা, ক্ষুধামান্দ্য প্রভৃতি কোনো লক্ষণ দেখা না দেয় তাহলে এই অধিক তাপমাত্রা কোনো সমস্যা নয়। 

মানুষ কি ১২০ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে বাঁচতে পারে?

১২০ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে মানুষের বেঁচে থাকা সম্ভব কি না এ ব্যাপারে রিউমর স্ক্যানার টিম ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিভাগের প্রধান এবং পপুলার মেডিকেল কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ ও মেডিসিনের অধ্যাপক, ডাঃ খান আবুল কালাম আজাদের অফিশিয়াল মেইলে জানতে চাইলে ফিরতি মেইলে তিনি জানান যে, শরীরের তাপমাত্রা দুটি স্কেল দ্বারা পরিমাপ করা হয়- ফারেনহাইট এবং সেলসিয়াস। এখানে সম্ভবত ১২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বোঝানো হয়েছে। ১০৪ ডিগ্রির উপরে তাপমাত্রা উঠে গেলে তাকে হাইপারপাইরেক্সিয়া বলা হয় এবং সেই তাপমাত্রায় একজন ব্যক্তির শরীরে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয় যার যেগুলো তার মৃত্যুর কারণ হয়। 

এছাড়াও, আমেরিকা ভিত্তিক চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য এবং সংবাদের ওয়েব-ভিত্তিক আউটলেট Medical News Today এর তথ্য অনুসারে মানব শরীরের তাপমাত্রা ১০৬.৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর বেশি হলে তাকে হাইপারপাইরেক্সিয়া বলা হয়। এর ফলে রোগীর শরীরে নানান ধরনের জটিলতার কারণে মৃত্যু হতে পারে। 

অতএব, ১০৮ ডিগ্রি জ্বর হলেই যেখানে মানুষের জীবন সংকটে পড়ে যায় সেখানে ১২০ ডিগ্রি জ্বর হওয়া তো অসম্ভব। সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে মানুষের ১২০ ডিগ্রি জ্বর হতে পারে এমন একটি তথ্য প্রচার হয়ে আসছে। অথচ বিশেষজ্ঞগন এই দাবির বিপক্ষেই কথা বলেছেন। তাছাড়া আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় কোনো মূলধারার গণমাধ্যমে ১২০ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে এর প্রমাণ  সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদনে খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

সুতরাং, ১২০ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তথ্যসুত্র 

Stanford Medicine-News:  Human body temperature has decreased in United States, study finds 

আনন্দবাজার: দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা আর ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট নয়

Insider: Body temperature isn’t a set number — here’s what is considered normal 

and how to know if you have a fever 

Discover magazine: Average Body Temperature Takes A Dip | Discover Magazine 

প্রথম আলো: প্রায় ১০০ ডিগ্রি জ্বর হলো নাকি? | প্রথম আলো 

কালের কণ্ঠ  দেহের ৯৯ ডিগ্রি তাপমাত্রা কি স্বাভাবিক নাকি জ্বর? | 537980 | কালের কণ্ঠ  

যুগান্তরঃ দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা কমছে! 

Medical News Today Normal body temperature: Adults, babies, pregnancy, and more  

Healthline  Normal Body Temperature: Babies, Kids, Adults 

NCBI: How is body temperature regulated and what is fever? 

Mayo Clinic: Heatstroke – Symptoms and causes

Medical News Today: Hyperpyrexia: Causes, symptoms, and treatment 

RS Team
RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img