কাতার আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতির কান ধরে দল ছাড়ার তথ্যটি গুজব

সম্প্রতি,’কাতার আওয়ামী লীগ শাখার সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী কান ধরে আওয়ামী লীগ ছেড়েছে‘ শীর্ষক দাবিতে একটি তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে। 

সম্প্রতি, ফেসবুকে প্রচারিত এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)। 

২০১৬ সালে ফেসবুকে প্রচারিত এমন কিছু পোস্ট এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
২০১৭ সালে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন  এখানে (আর্কাইভ)।
২০১৮ সালে ফেসবুকে প্রচারিত এমনকিছু পোস্ট এখানে (আর্কাইভ) এবংএখানে (আর্কাইভ) ।
২০১৯ সালে ফেসবুকে প্রচারিত এমন কিছু পোস্ট এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
২০২০ সালে ফেসবুকে প্রচারিত এমনকিছু পোস্ট এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, কাতার আওয়ামী লীগ শাখার তৎকালীন সভাপতি ও বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা ওমর ফারুক চৌধুরীর কান ধরে আওয়ামী লীগ ছাড়ার দাবিতে প্রচারিত তথ্যটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জে জাতীয় পার্টির স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান কর্তৃক শ্যামল কান্তি ভক্ত নামে এক শিক্ষককে কান ধরে ওঠবোস করানোর প্রতিবাদে নিজেই কান ধরে ওঠবোস করেছিলেন ওমর ফারুক চৌধুরী।   

দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে রিউমর স্ক্যানার টিম আওয়ামী লীগ, কাতার শাখার সাবেক সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরীর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে  ২০১৬ সালের ২৪ মে ‘আন্তরিক শুভেচ্ছা সতর্কীকরণ (আর্কাইভ)’ শীর্ষক শিরোনামে প্রদত্ত একটি পোস্ট খুঁজে পায়। 

Screenshot: Omar Faroque Chowdhury Post

পোস্টটিতে ওমর ফারুক চৌধুরী লিখেন, ‘সম্মানিত আমার সকল বন্ধু, সমাজসেবক, রাজনৈতিক কর্মী, সকল ব্যক্তির প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা। গত দুই দিন আগে আমার ফেসবুক আইডিতে নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। আমার ছবির সঙ্গে সেখানে এগারোটি ছবিসহ এই বিষয় ৭/৮ লাইন লেখা ছিল। কিন্তু খুব দুঃখের বিষয় কোন ভিন্ন মত পোষনকারী ব্যক্তি ফেইক আইডি থেকে কান ধরা আমার ছবিটা পৃথক করে (আমি চিরকালের জন্য আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে অবসরে যাচ্ছি) অনুরূপ পোস্ট দিয়ে অপপ্রচার করে। যে বিষয়টির জন্য অনেক বন্ধু আমাকে কল করে জানতে চায় কি ঘটছে?

তিনি পোস্টে আরও লিখেন, ‘এখানে নিজের সম্পর্কে বিবৃতি দেওয়া দরকার। আমি পঞ্চম শ্রেণীতে থেকে আমার শিশু কর্মী হিসাবে রাজনৈতিক কাজ শুরু।  এরপর ছাত্রলীগ, স্বাধীনতা যুদ্ধ, যুবলীগ ও বর্তমান আওয়ামী লীগের সাথে জড়িত। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মুজিববাদকে ধারণ করে এই পর্যন্ত অবস্থান করছি। আমি বঙ্গবন্ধুর শুধুমাত্র নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। আমি অস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি যাদের সাথে তারা   হলেন বীরপুরূষ আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, এহচানুল হক ইনু, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, আলতাফ হোসেন গোলনদাছ এবং আরও অনেক অনেক ব্যক্তিত্ব I এই আমি নগণ্য রাজনৈতিক কর্মী দেশের জন্য অধিকতর কিছু করতে না পারলেও বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জীবনের মায়া ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পরে রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করেছি এবং দেশ স্বাধীনতা লাভ করে।বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি আমার পেশা, আমার নেশা এবং তৃণমুল থেকে উটে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক চৌধুরী মুজিব আদর্শের আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসাবে আমরণ পর্যন্ত নিবেদিত থাকবেই এবং অবসরে যেতে পারে না। সবাই ভাল থাকুন এবং শুভ কামনা রইলো।’

তার এই দীর্ঘ এই পোস্টটি প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে অন্যান্য আরও কিছু ছবির সঙ্গে তিনি তারা অ্যাকাউন্টে কানেধরে ওঠবোসের একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে তার এই ছবিটিকেই কানধরে ওঠবোস করে আওয়ামী লীগ ছাড়ছেন দাবিতে ইন্টারনেটে প্রচার করা হচ্ছে।

অর্থাৎ ওমর ফারুক চৌধুরীর নারায়নগঞ্জে শিক্ষক লাঞ্চনার প্রতিবাদের ঘটনায় ধারণকৃত একটি ছবিকে তার আওয়ামী লীগ ছাড়ার ভিন্ন দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।

ওমর ফারুক চৌধুরী কি বর্তমানে আওয়ামী লীগে আছেন?

রিউমর স্ক্যানার টিম অনুসন্ধানের এই পর্যায়ে ওমর ফারুক চৌধুরীর সঙ্গে বর্তমানে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না তা যাচাই করে দেখে। এক্ষেত্রে কি-ওয়ার্ড অনুসন্ধানের মাধ্যমে দৈনিক যুগান্তরের অনলাইন সংস্করণে ২০১৯ সালের ১ আগস্ট “কাতার আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। 

প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, ওমর ফারুক চৌধুরী সে সময় কাতার আওয়ামী লীগ শাখার প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন।

Screenshot: Jugantor 

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে ২০১৯ সাল পরবর্তী সময়েও গণমাধ্যম সূত্রে ওমর ফারুক চৌধুরীকে কাতার আওয়ামী লীগের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। 

Image Collage: Rumor Scanner 

এ সম্পর্কিত কিছু প্রতিবেদন দেখুন 

গণমাধ্যমের এসব প্রতিবেদন ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বরাতেও ওমর ফারুক চৌধুরীকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও আয়োজনে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। 

যেমন, চলতি বছরের গত মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর কাতার সফরের সময় ওমর ফারুক চৌধুরীকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মতবিনিময় সভায় উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। যেটি তিনি তার নিজ ফেসবুক অ্যাকাউন্টেই গত ২৫ মে প্রকাশ করেন।

Screenshot: Omar Faroque Chowdhury Post

এছাড়া গত ২৩ শে জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৪ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে কাতার শাখা আয়োজিত কেক কাটা ও আলোচনা সভার অনুষ্ঠানেও প্রধান অতিথি হিসেবে ওমর ফারুক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

Image collected from Facebook 

অর্থাৎ, দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত পোস্টগুলোর দাবি অনুযায়ী, ওমর ফারুক চৌধুরী কান ধরে ওঠবোস করে আওয়ামী লীগ ছেড়েছেন। তবে রিউমর স্ক্যানার টিমের বিস্তারিত অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওমর ফারুক চৌধুরী আওয়ামী লীগ ছাড়েননি। তিনি  দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগ, কাতার শাখার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

মূলত, ২০১৬ সালের মে মাসে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের বিরুদ্ধে স্কুলটির দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে শাসন করার সময় ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করার অভিযোগ উঠে। পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে শ্যামল কান্তি ভক্তকে কান ধরে ওঠবোস করানো হয়েছিল। এই ঘটনায় দেশের সচেতন নাগরিকেরাও কান ধরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। এরই প্রেক্ষিতে কাতার আওয়ামী লীগ শাখার তৎকালীন সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরীও কানে ধরা ফেসবুকে ছবি পোস্ট দিয়ে প্রতিবাদ জানান। তবে তার কান ধরার এই ছবিটিই পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি কান ধরে আওয়ামী লীগ ছেড়েছেন দাবিতে প্রচার করা হয়। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, তিনি আওয়ামী লীগ ছাড়েননি বরং বর্তমানে তিনি আওয়ামী লীগ, কাতার শাখার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সুতরাং, কাতার আওয়ামী লীগ শাখার সাবেক সভাপতি ও বর্তমান প্রধান উপদেষ্টা ওমর ফারুক চৌধুরীর কান ধরে আওয়ামী লীগ ছাড়ার দাবিতে প্রচারিত তথ্যটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। 

তথ্যসূত্র

RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img