ঘূর্ণিঝড় রিমালে শিশু ভেসে এসেছে দাবিতে জম্মু-কাশ্মীরের ভিডিও ভাইরাল

গত ২৬ মে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় রিমাল বাংলাদেশের সাতক্ষীরা ও পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপের মাঝামাঝি এলাকার উপকূলে আঘাত হানে। এই ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া গেছে।

এরই মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে একজন শিশুর ভেসে আসার দৃশ্য দাবিতে একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। 

শিশু ভেসে

উক্ত দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

একই দাবিতে টিকটকে প্রচারিত ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ)। 

টিকটকে ভাইরাল এই ভিডিওটি ইতিমধ্যে প্রায় ১২ লক্ষ বার দেখা হয়েছে। ভিডিওটিতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৫ হাজার ভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতিক্রিয়া এসেছে। ভিডিওটি সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি বার শেয়ার করা হয়েছে এবং এতে ২ হাজারের বেশি মন্তব্য করা হয়েছে।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচ্য ভিডিওটি বাংলাদেশে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় রিমালের সাথে সম্পর্কিত নয় বরং এটি ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের ঝিলাম নদীতে ভেসে যাওয়া এক শিশুকে উদ্ধারের দৃশ্য।

ভিডিওটিতে হিন্দি ভাষায় কথাবার্তা শোনা যায়, যা ভিডিওটির সত্যতা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে, ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করতে কিছু স্থিরচিত্র রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় মূলধারার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের ইউটিউব চ্যানেলে গতকাল ২৮ মে প্রচারিত একটি ভিডিও প্রতিবেদনে একই দৃশ্য দেখা যায়। এই ভিডিও প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভারতের জম্মু-কাশ্মীরে ঝিলাম নদী থেকে দুজন ব্যক্তি সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করেন।

পরবর্তীতে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল নিউজ১৮ এর ওয়েবসাইটে গত ২৭ মে একই বিষয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদ পাওয়া যায়। এই সংবাদ থেকে আলোচ্য ভিডিওটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়।

প্রতিবেদনটি অনুসারে, “জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরের সাফাকাদাল এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা সাত বছরের এক শিশুকে ঝিলাম নদী থেকে উদ্ধার করেছেন। শিশুটি নদীতে পড়ে গেলে কয়েকজন সাহসী বাসিন্দা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে তাকে উদ্ধার করেন এবং সিপিআর (কৃত্রিম শ্বাস দেওয়ার প্রক্রিয়া) প্রদান করেন। স্থানীয় একটি সংবাদ সংস্থার এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে শেয়ার করা ভিডিওতে পুরো ঘটনাটি দেখা যায়।

ওই ভিডিওতে দেখা যায়, একজন তৎক্ষণাৎ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে শিশুটির দিকে সাঁতরে যান এবং তাকে ধরে নদীর তীরে নিয়ে আসেন, যেখানে কিছু লোক ইতোমধ্যেই অপেক্ষা করছিলেন। শিশুটি তখন জীবিত ছিল এবং তাকে সিপিআর প্রদানের পর উদ্ধারকারীরা তার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান।

মে মাসে তৃতীয়বারের মতো এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৬ মে আব্দুল রহিম নামের ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি পানির জন্য ঝিলাম নদীতে গিয়ে ডুবে যান। এছাড়া, জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামা এলাকায় আরেকটি নৌকাডুবির ঘটনায় দুজন উত্তর প্রদেশের বাসিন্দা নিখোঁজ হন এবং সাতজনকে উদ্ধার করা হয়। এর আগে, এপ্রিল মাসে ঝিলাম নদীতে একটি নৌকা ডুবে গেলে সাতজনেরও বেশি মানুষ মারা যায় এবং অনেকেই নিখোঁজ হন।”

এই প্রতিবেদনের সূত্রে জম্মু-কাশ্মীর নিউজ নেটওয়ার্ক নামের এক্স অ্যাকাউন্টে গত ২৬ মে প্রকাশিত ১ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের মূল ভিডিওটি পাওয়া যায়। এই ভিডিওটিই বর্তমানে ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে প্রচার করা হচ্ছে।

Screenshot: X/TheYouthPlus. 

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, উক্ত প্রতিবেদনগুলোতে অথবা বিশ্বস্ত কোনো সূত্রে শিশুটি ঘূর্ণিঝড়ের কারণে নদীতে পড়ে গিয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়নি। এছাড়া, সম্প্রতি ভারতের জম্মু-কাশ্মীরে কোনো ঘূর্ণিঝড়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।

মূলত, সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় রিমালের কারণে বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এই প্রেক্ষাপটে ঘূর্ণিঝড়ে একজন শিশু ভেসে এসেছে দাবিতে একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে। রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, দাবিকৃত ভিডিওটি মূলত ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের ঝিলাম নদী থেকে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে উদ্ধারের। এছাড়া, সম্প্রতি ওই এলাকায় কোনো ঘূর্ণিঝড়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রভাবে উচ্চ জোয়ারের পানিতে ভেসে গিয়ে দেশের একাধিক স্থানে (,) মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

সুতরাং, ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের ঝিলাম নদীতে ভেসে যাওয়া এক শিশুকে উদ্ধারের ভিডিও ঘূর্ণিঝড় রিমালের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে প্রচার করা হচ্ছে; যা বিভ্রান্তিকর।

তথ্যসূত্র

RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img