ছবিটি ১৯৭১ সালে লুঙ্গি খুলে হিন্দু-মুসলমান পরীক্ষার নয়

সম্প্রতি “পাকিস্তানি সৈন্য পথচারীর লুঙ্গি খুলে দেখছে সে হিন্দু না মুসলমান” শীর্ষক শিরোনামে একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

ফেসবুকে প্রচারিত এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে
পোস্টগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ছবিটি কোনো পাকিস্তানি সৈন্য কর্তৃক পথচারীর লুঙ্গি খুলে হিন্দু না মুসলমান তা পরীক্ষা করার কোনো দৃশ্য নয় বরং ছবিটি একজন ভারতীয় সেনা সদস্য কর্তৃক পাকিস্তানি গুপ্তচর সন্দেহে লুঙ্গির ভিতর অস্ত্র তল্লাশি করার দৃশ্য।

রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে ভারতীয় চিত্র সাংবাদিক কিশোর পারেখের ১৯৭২ সালে প্রকাশিত বই ‘Bangladesh: A Brutal Birth‘ বইয়ের ২২ নাম্বার পৃষ্ঠায় আলোচিত ছবিটি খুঁজে পাওয়া যায়।

ছবিটির বিস্তারিত বিবরণী থেকে জানা যায়, ভারতীয় সেনারা পাকিস্তানি গুপ্তচর সন্দেহে গ্রামের লোকদের তল্লাশি করছিলেন। পাশাপাশি লুঙ্গির ভিতরে অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে কি না তাও তল্লাশি করছিলেন।

অর্থাৎ, ছবিতে থাকা তল্লাশিরত সেনা সদস্যটি পাকিস্তানি নয় এবং ছবিটিতে হিন্দু বা মুসলমান এমন কিছু যাচাই করা হচ্ছিল না। বরং ভারতীয় সেনারা পাকিস্তানি গুপ্তচর সন্দেহে গ্রামের লোকদের তল্লাশি করছিলেন। পাশাপাশি লুঙ্গির ভিতরে অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে কি না তাও তল্লাশি করছিলেন।

ছবিটি কিভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নামে ছড়ালো?

এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানে ২০১২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক নয়নিকা মুখার্জীর ‘The absent piece of skin: Gendered, racialized and territorial inscriptions of sexual violence during the Bangladesh war*‘ শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

গবেষণাপত্রটি থেকে জানা যায়, ছবিটি সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালে দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকার গণহত্যা সংখ্যায় অধ্যাপক গোলাম জিলানী নজরে মোরশেদের ‘হানাদারদের ঘাঁটি ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ’ শীর্ষক শিরোনামে একটি কলাম লিখেন৷ এই কলামে ব্যবহৃত আলোচিত ছবিটির শিরোনামে লেখা হয়, ওরা মানুষ, বর্বরদের কাছে সেটা পরিচয় নয়-বড় কথাটি ছিল ওরা হিন্দু না মুসলমান। তাই উলঙ্গ করে দেখছে। 

এরপর থেকে ছবিটি এভাবেই প্রচার হয়ে আসছিলো। যেমন, ২০১৬ সালে ফেসবুকে প্রচারিত এমন একটি পোস্ট দেখুন এখানে। 

তবে গবেষক নয়নিকা মুখার্জী তার গবেষণায় কিশোর পারেখের  ‘Bangladesh: A Brutal Birth‘ এর সূত্রে প্রমাণ করেন ছবির সেনা সদস্যটি পাকিস্তানি সেনা সদস্যের নয় বরং ভারতীয় মিত্র বাহিনীর।

পরবর্তীতে কিশোর পারেখ নিয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, কিশোর পারেখের জন্ম ভারতের গুজরাটের ভাবনগর জেলায়। ফিল্ম মেকিং অ্যান্ড ডকুমেন্ট্রি ফটোগ্রাফি বিষয়ে পড়াশোনা করেন ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়াতে। পরবর্তীতে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ডিসেম্বরে তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং ১৬ ডিসেম্বরের পূর্বে ৫ দিন মুক্তিযুদ্ধের সাতষট্টিটি ছবি তুলেন। সেই ছবিগুলো নিয়ে ১৯৭২ সালে ’Bangladesh: A Brutal Birth’ একটি বই প্রকাশ করেন তিনি।
প্রসঙ্গত, গত ১০ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিএনপির গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টন এলাকায়  বসবাসরতদের ঢুকতে দেওয়া হলেও তাদের মেসেঞ্জার-হোয়াটসঅ্যাপ পুলিশ কর্তৃক চেক করা হয়েছে বলে একাধিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখুন ইনকিলাব, আরটিভি, কালবেলা

রাজধানীতে পুলিশের মোবাইল চেক করার এমনই একটি ভিডিও প্রতিবেদন থেকে স্ক্রিনশট নিয়ে সেটিকে উক্ত ছবিটির সাথে তুলনামূলক পরিস্থিতি দেখাতে প্রচার করা হচ্ছে।

তবে রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি সৈন্যের ছবির দাবিতে প্রচারিত ছবিটিতে দৃশ্যমান সেনাটি পাকিস্তানি নয় এবং ছবিটি হিন্দু-মুসলমান পরিচয়ও যাচাই করা হচ্ছিল না, বরং ভারতীয় সেনারা পাকিস্তানি গুপ্তচর সন্দেহে গ্রামের লোকদের তল্লাশি করছিলেন। পাশাপাশি লুঙ্গির ভিতরে অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে কি না তাও তল্লাশি করছিলেন।

মূলত, আলোচিত ছবিটি তুলেছিলেন কিশোর পারেখ নামে একজন ভারতীয় চিত্রগ্রাহক। যিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আসেন এবং ১৬ ডিসেম্বরের পূর্বে ৫ দিন মুক্তিযুদ্ধের সাতষট্টিটি ছবি তুলেন এবং ছবিগুলো নিয়ে ১৯৭২ সালে  ’বাংলাদেশ: আ ব্রুটাল বার্থ’ বই নামে একটি বই প্রকাশ করেন। যেখানে ‘ভারতীয় সেনারা পাকিস্তানি গুপ্তচর সন্দেহে গ্রামের লোকদের তল্লাশি করছিলেন। পাশাপাশি লুঙ্গির ভিতরে অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে কি না তাও তল্লাশি করছিলেন।’ শীর্ষক শিরোনামে ভারতীয় সেনার একটি তল্লাশির ছবিও প্রকাশ করেন৷ তবে পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে এই ছবিটিকেই পাকিস্তানি সেনা দাবিতে প্রথম প্রচার করা হয় এবং দীর্ঘদিন এভাবেই প্রচার হয়ে আসছিল। তবে ২০১২ সালে যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক নয়নিকা মুখার্জীর একটি গবেষণায় এ সংক্রান্ত ভুলটি সামনে নিয়ে আসেন এবং কিশোর পারেখের  ‘Bangladesh: A Brutal Birth’ এর সূত্রে প্রমাণ করেন ছবির সেনা সদস্যটি পাকিস্তানি সেনা সদস্যের নয় বরং ভারতীয় মিত্র বাহিনীর। 

সুতরাং, ভারতীয় সেনারা পাকিস্তানি গুপ্তচর সন্দেহে গ্রামের লোকদের লুঙ্গির ভিতরে অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে কি না তা তল্লাশির ঘটনার ছবিকে পাকিস্তানি সৈন্য পথচারীর লুঙ্গি খুলে হিন্দু না মুসলমান তা পরীক্ষার দাবিতে ছবিটি ১৯৭২ সাল থেকে প্রচার হয়ে যা আসছে; যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তথ্যসূত্র 

RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img