শনিবার, জুলাই 13, 2024
spot_img

দিনে দুই হাজার টাকা আয়ের সুযোগ দাবিতে হোয়াটসঅ্যাপ থেকে টেলিগ্রামে প্রতারণার ফাঁদ 

সম্প্রতি, দেশের অসংখ্য মুঠোফোন ব্যবহারকারী একটি খুদে বার্তা পেয়েছেন। ফেসবুকে এ সংক্রান্ত খুদে বার্তাটির স্ক্রিনশট শেয়ার করেছেন বহু মানুষ। রিউমর স্ক্যানার টিম ফেসবুক মনিটরিং টুল এবং ম্যানুয়াল পর্যবেক্ষণে দেখেছে, খুদেবার্তাটির ভাষা প্রায় একই রকম যাতে লেখা রয়েছে, “Dear, you have successfully passed interview. Give me reply today to receive 2000TK,Click: https://wa.me/8801331630313

এই খুদেবার্তাটি একেকজন একেক ফোন নাম্বার থেকে পেয়েছেন। কিন্তু টাকার পরিমাণটি একই উল্লেখ রয়েছে৷

দিনে দুই হাজার টাকা
Screenshot collage: Rumor Scanner  

রিউমর স্ক্যানার টিমের কাছে এই বিষয়ে অসংখ্য জিজ্ঞাসা এবং এই অফারের সত্যতা জানতে চেয়ে মেসেজ আসার পর আমরা বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করি৷ 

আমরা এই খুদেবার্তা পাওয়া এবং পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট ধাপগুলো অনুসরণ করা এক ব্যক্তির সন্ধান পেয়েছি। গত ১৫ নভেম্বর তিরা মোস্তফা নামে ওই নারীর কাছে একই খুদেবার্তা আসে +8801758861759 নাম্বার থেকে।

Screenshot: Tira Mustafa

আমরা নাম্বারটি যাচাই করে দেখেছি, এটি কোনো একটি সি-ফুড রেস্টুরেন্টের Santos, Bruce and Shea নামে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার। 

Screenshot: WhatsApp

তিরা বলছিলেন, “সন্দেহ ছিল যে এটা স্ক্যাম, তাও নক দিলাম আমার দ্বিতীয় একটি হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার থেকে।” 

মেসেজ পাঠানোর পর প্রতিত্তোরে তিরাকে বলা হয়, প্রতিদিন অবসর সময়ে ফেসবুকের নির্দিষ্ট কিছু ভিডিওতে লাইক দেওয়ার বিনিময়ে প্রতি লাইকের বিনিময়ে ৫০ টাকা করে দেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ায় দিনে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব বলেও জানানো হয়।  

রিউমর স্ক্যানার টিমকে তিরা বলছিলেন, তাকে শুরুতে তিনটি ফেসবুক ভিডিও লিংক পাঠানো হয়। এই ভিডিওগুলো গত জুনে জার্মানভিত্তিক স্বনামধন্য একটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়েছিল। 

Screenshot: Tira Mustafa/Whatsapp

তিরা ভিন্ন একটি অ্যাকাউন্ট থেকে লাইক রিয়েক্ট দিলেন ৩টি পোস্টেই। উক্ত ব্যক্তির নির্দেশনা মেনে পাঠালেন এ সংক্রান্ত স্ক্রিনশটও। পরবর্তীতে তিরাকে একটি টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্ট দেওয়া হয়, যার লিংক https://t.me/NuwairaAhamedHridhi। এই লিংকে গিয়ে নির্দিষ্ট জব কোড দেওয়ার পর তাকে ১৫০ টাকা বিকাশের মাধ্যমে পাঠানো হয়। 

Screenshot: Tira Mustafa/Whatsapp

আমরা অ্যাকাউন্টটি যাচাই করে দেখেছি, এটি এখন আর সচল নেই। তিরা আমাদের কাছে বিকাশ পেমেন্টের স্ক্রিনশটটিও পাঠিয়েছেন। তাকে 01932831884 এই নাম্বার থেকে বিকাশ করা হয়েছিল। 

আমরা নাম্বারটি ট্রু-কলারে যাচাই করে দেখেছি, এটি উজ্জ্বল (Ujjal) নামে কোনো এক ব্যক্তির নামে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফেসবুকে চলতি বছর এমন আরো কিছু অফার সংক্রান্ত একাধিক পোস্টে (, , ) একই নাম্বার ব্যবহার করে বিকাশের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করার প্রমাণ মিলেছে।  

Screenshot collage: Rumor Scanner  

তিরা রিউমর স্ক্যানার টিমকে বলছিলেন, এরপর তাকে বলা হলো ৩২ টি টাস্ক সম্পন্ন করতে পারলে ১৬০০ টাকা পাবেন তিনি। তবে আগে তাকে ইনভেস্ট বা বিনিয়োগ করতে হবে। তিরা তাদের সাথে আর কথোপকথন চালিয়ে যেতে চাননি। টেলিগ্রাম গ্রুপটি থেকে লিভ নিয়ে নেন তিনি। 

তিরা বলছেন, এরা শুরুতেই বিনিয়োগের কথা বলে না। টাস্ক দিতে থাকে। এরপর হঠাৎ করে বিনিয়োগ করতে বলে। বিনিয়োগ না করলে প্রতি টাস্কের বিপরীতে ৫০ টাকার পরিবর্তে ২৫ টাকা দেয়। এরপর আবার এভাবে চারটা টাস্ক সম্পন্ন করার পর বিনিয়োগের টাস্ক আসে। তখনও বিনিয়োগ না করলে ২৫ টাকা থেকে টাস্ক প্রতি উপার্জন ৫ টাকায় নেমে আসে। এরপর ওরা বলে, যদি বিনিয়োগ না করি তাহলে সারাদিনে যে টাকা উপার্জন হবে সেটা তারা দেবে না।  

তিরা হোয়াটসঅ্যাপের যে স্ক্রিনশট শেয়ার করেছেন তাতে আলোচিত নাম্বারটিতে এক নারীর ছবি দেখা যাচ্ছে। তিরা আমাদের জানিয়েছেন, টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টটিতেও একই ছবি ছিল। আমরা ছবি এবং টেলিগ্রামের অ্যাকাউন্টটির নামের সূত্র (NuwairaAhamedHridhi) ধরে ফেসবুকে এই নামে একই নারীর দুইটি অ্যাকাউন্টের (, ) খোঁজ পেয়েছি। এর মধ্যে একটি অ্যাকাউন্টে গত ২২ অক্টোবর আলোচিত ছবিটি প্রকাশ করা হয়। 

Screenshot collage: Rumor Scanner

হ্রদি নামের এই নারী চলতি বছর ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে রিউমর স্ক্যানার টিম। তার অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ করে জানা যাচ্ছে, তিনি প্রায়ই কনটেন্ট প্রমোশনের কাজ করে থাকেন। রিউমর স্ক্যানার টিমের পক্ষ থেকে তার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি। 

এই কেস স্টাডিতে আমরা যে পন্থা অবলম্বন করতে দেখেছি তা যে সকলের ক্ষেত্রেই একইরকম এমন নয়। 

ইউটিউবে আমরা গত ০২ নভেম্বর প্রকাশিত একটি ভিডিও খুঁজে পেয়েছি যেখানে একইরকম আরেকজন ভুক্তভোগীর কেস স্টাডি শেয়ার করা হয়েছে। এই কেস স্টাডিতেও একই পন্থা এমনকি একই নারীর (NuwairaAhamedHridhi) নাম সম্বলিত টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্ট ব্যবহার হতে দেখা গেছে। 

Screenshot: YouTube

তবে এক্ষেত্রে ভিন্ন বিকাশ নাম্বার (01878435234) ব্যবহার করা হয়েছে। ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করা দেখা যায়, ভুক্তভোগী দুই দফায় (প্রথমে তিন এবং পরে ১৬ হাজার) নির্দেশদাতাকে প্রায় ১৯ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। তৃতীয় টাস্কের অংশ হিসেবে তাকে আরো ৩৪ হাজার টাকা পাঠাতে বলা হয়। জানানো হয়, এই টাকা পাঠালে তাকে ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। কিন্তু তার কাছে সমপরিমাণ অর্থ না থাকায় তিনি পাঠাতে পারেননি। 

রিউমর স্ক্যানার টিমের কাছে আরো একজন ভুক্তভোগী সমজাতীয় প্রতারণায় শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। মাহিন দেওয়ান নামে এই ব্যক্তির কাছে সম্প্রতি একটি ফোনকল আসে। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে এক ব্যক্তি মাহিনকে বলেন, তাদের হাতে একটা কাজ আছে। টিকটক আইডি ফলো করলে ২০ টাকা করে দেওয়া হবে। এরপর হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে চক্রটির সাথে যোগাযোগ শুরু হয় মাহিনের। হোয়াটসঅ্যাপে মাহিনকে চক্রের অন্য এক সদস্য ল প্লে স্টোরে থাকা নির্দিষ্ট অ্যাপ্লিকেশনের প্রচারণার কাজের অফার দেন। তাদের নির্দেশনা মেনে নির্দিষ্ট অ্যাপ্লিকেশন ইন্সটল করলে ৫০ টাকা করে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। মাহিন অ্যাপ্লিকেশনগুলো ইনস্টল করার পর তাকে টাকা পাঠানো হয়। এরপর তাকে ১৭০০ টাকা পাঠাতে বলা হয়। জানানো হয়, এই টাকা পাঠালে তাকে প্রায় ২২০০ টাকা দেওয়া হবে। মাহিন তাদের কথামতো ১৭০০ টাকা পাঠালেও তিনি ২২০০ টাকা পাননি। 

সাম্প্রতিক সময়ের এই প্রতারণাগুলোর বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন  কাজ শুরু করেছে। সাইবার অপরাধ ইনভেস্টিগেশন বিভাগের এডিসি নাজমুল ইসলাম বলছেন, “ওই চাকরির মেসেজ নিয়ে আমাদের কাছে দু-একটা অভিযোগও এসেছে। আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। হয়তো অচিরেই এই অপরাধীদের শনাক্ত করা যাবে। তার আগে আমরা স্বউদ্যোগী হয়ে সচেতনতা তৈরিরও চেষ্টা চালাচ্ছি-যাতে কেউ এদের ফাঁদে পা না দেয়।” 

তাদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একটি সচেতনতামূলক ফেসবুক পোস্টও দেওয়া হয়েছে। 

Screenshot: Facebook 

এতে লিংকে ক্লিক না করে এসএমএস মুছে ফেলার পরামর্শ যেমন দেওয়া হয়েছে, তেমনই এসএমএস পাঠানো নম্বরগুলোকে ব্লক করে দিতে বলেছে পুলিশ। 

অর্থাৎ, মুঠোফোনে খুদেবার্তা এবং সরাসরি ফোনকলের মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে চাকরির অফার পেয়েছেন দেশের অসংখ্য মানুষ৷ রিউমর স্ক্যানার টিম এই ধরণের তিনটি প্রতারণার কেস স্টাডি এই লেখায় তুলে ধরেছে। এগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, দৈবচয়নভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে মুঠোফোনে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আয়ের সুযোগের কথা জানিয়ে খুদেবার্তা বা ফোনকল দেওয়া হয়৷ কেউ যদি তাতে সাড়া দেয়, তাকে কিছু টাস্ক দেওয়া হয়। টাস্ক সম্পন্ন হওয়া সাপেক্ষে প্রথমদিকে কিছু অর্থ প্রদান করা হলেও পরবর্তীতে বিনিয়োগ করতে প্রলুব্ধ করা হয় ভুক্তভোগীকে। কেউ সে ফাঁদে পা দিয়ে অর্থ খুইয়ে প্রতারিত হওয়ার প্রমাণও মিলেছে। তবে পুলিশ এ বিষয়ে কাজ করছে এবং অচিরেই এই অপরাধীদের শনাক্ত করা যাবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।  

তথ্যসূত্র

RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img