রবিবার, জুলাই 21, 2024
spot_img

ঢাকার মেট্রোরেলে ব্যবহৃত প্রযুক্তি জাপানেরও নেই দাবিটি আংশিক মিথ্যা

সম্প্রতি, “দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধুনিক প্রযুক্তি মেট্রোরেলে -যা জাপানেও নেই” শীর্ষক শিরোনামে একটি তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

ফেসবুকে প্রচারিত কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানেএখানে
পোস্টগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানেএখানে

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে জানা যায়, মেট্রোরেলের মতো আধুনিক প্রযুক্তি জাপানেরও নেই এই দাবিটি সত্য নয়, বরং জাপানের প্রযুক্তি ব্যবহারেই তৈরী হয়েছে বাংলাদেশের মেট্রোরেল।

অনুসন্ধানে, গত ১১ মে ২০২১ দেশীয় মূলধারার গণমাধ্যম ‘Dhaka Tribune’ এ “Japan: One step closer to completing historic Metro Rail project in Bangladesh” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মেট্রোরেল পরিচিতি অনুষ্ঠানে জাপানের রাষ্ট্রদূত “ইতো নাওকি” মেট্রোরেলে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগুলো সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, জাপানি কোম্পানি “কাওয়াসাকি ইন্ডাস্ট্রি” মেট্রোরেলের গাড়িগুলো তৈরী করেছে। জাপানি রলওয়ে সিগনাল সিস্টেমগুলির মধ্যে সর্বাধুনিক সিস্টেম “CBTC (Communication Based Train Control)” সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশের মেট্রোরেলে। মেট্রোরেলের অটোমেটিক টিকিট গেটের পাসের চিপ তৈরী করেছে জাপানি কোম্পানি “সনি”। এছাড়া, মেট্রোরেলে ব্যবহৃত হয়েছে “ESS (Energy Storage System)”, যা একটি জাপানি প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি তৈরী বিখ্যাত জাপানি কোম্পানি তোশিবা। 

পরবর্তীতে, ১১ মার্চ ২০২০ তারিখে ‘Toshiba’র ওয়েবসাইটে নিউজ রিলিজ সেকশনে “TOSHIBA to Deliver Traction Energy Storage Systems for Dhaka Mass Rapid Transit” শীর্ষক শিরোনামে একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। 

এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তোশিবা বলেছে, কাওয়াসাকি, জাপান-তোশিবা ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিস্টেমস অ্যান্ড সলিউশন কর্পোরেশন (এরপরে TISS) আজ ঘোষণা করেছে যে এটি ভারতের একটি প্রধান ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট ও কন্সট্রাকশন অপারেটর কোম্পানি ‘Larsen & Toubro’র সাথে বাংলাদেশের Mass Rapid Transit এর জন্য ৮ সেট ট্রাকশন এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম ডেলিভারি দেওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হচ্ছে। তাদের ডেলিভারি ২০২০ সালের দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হবে।

পরবর্তীতে, ১৮ মার্চ ২০১৯ দেশীয় মূলধারার দৈনিক “যায়যায়দিন” এ “মেট্রোরেলে স্ক্রু পাইলিং কমেছে ভোগান্তি” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ম্যানুয়ালি নয় জাপানি প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পিলার নির্মাণ করা হচ্ছে। এজন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ‘স্ক্রু-পাইপ পাইলিং’ জাপানি প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তি বর্তমানে বিশ্বের ১৬৮টি প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়। এ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে আগের চেয়ে লোকবলও কম লাগছে এবং ধুলাবালি কম ওড়ায় জনগণের কম ভোগান্তি হচ্ছে। ‘স্ক্রু-পাইপ পাইলিং’ প্রযুক্তি ব্যবহারে ফলে বেঁধে দেয়া সময়ের আগেই মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণ সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।”

পরবর্তীতে, ২৯ নভেম্বর ২০২২ তারিখে দেশীয় মূলধারার গণমাধ্যম ‘Jagonews24.com’ এ “‘জাপানের প্রযুক্তিতে পরিচালনা করা হবে ঢাকার মেট্রোরেল’” শীর্ষক শিরোনামে একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, উন্নত সব প্রযুক্তি ব্যবহার করায় মেট্রোরেলটি সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ থাকবে। এটি যারা তৈরি করছেন বা পরামর্শক হিসেবে আছেন তারা জাপানি প্রতিষ্ঠান। জাপানে কয়েক যুগ ধরে মেট্রোরেল তারা চালাচ্ছেন। তাদের কোনো ধরনের দুর্ঘটনার রেকর্ড নেই। জাপানে যে প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে, সেই একই প্রযুক্তিতে আমাদের মেট্রোরেল পরিচালনা করা হবে।

এছাড়া, ৬ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে দেশীয় মূলধারার গণমাধ্যম ‘ekattor.tv’ তে “রাজধানীর মেট্রোরেল চলবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে” শীর্ষক শিরোনামে একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, “ঢাকার মেট্রোরেলে যুক্ত হয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। বিদ্যুতে চলা এই রেলে থাকছে ব্যাটারির ব্যাক আপ। যেটাকে বলা হচ্ছে এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম। কোন কারণে বিদ্যুৎ বিপর্যয় হলে তখন ট্রেনটিকে পরের স্টেশন পর্যন্ত টেনে নেবে এই ব্যাটারি। এই প্রযুক্তিকে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম বলছেন জাপানি প্রকৌশলীরা। এছাড়া ট্রেনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও সর্বাধুনিক। জাপানিজ কোম্পানিগুলো এই প্রকল্পে যে প্রযুক্তি নিয়ে এসেছে, সেটি আবার ব্যবহৃত হতে পারে।”

মূলত, জাপানি সংস্থার ‘জাইকা’র পরামর্শে ও জাপানি প্রযুক্তি ব্যবহারে তৈরী হয়েছে মেট্রোরেল। জাপানি প্রযুক্তি ব্যবহার করেই রেলকার এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশ তৈরি হয়েছে । মেট্রোরেলে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগুলো বিভিন্ন জাপানি কোম্পানি সরবরাহ করেছে। ইঞ্জিনিয়ারদের করা ডিজাইনে জাপানি ইঞ্জিনিয়ারদের তত্ত্বাবধায়নে বাংলাদেশের মেট্রোরেলের তৈরি ্করা হয়েছে । জাপানি প্রযুক্তিগুলোর মধ্যে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। কিছু কিছু প্রযুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে প্রথমবার ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে, সেই প্রযুক্তির উদ্ভাবক স্বয়ং জাপান। এই তথ্যটিকেই বিকৃত করে ঢাকার মেট্রোরেলের প্রযুক্তি জাপানেও নেই দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, মেট্রোরেল উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রীর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে হলি আর্টিজেনে নিহত জাপানিদের নামে স্টেশনের নামকরণের গুজব ছড়িয়ে পড়লে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে রিউমর স্ক্যানার। 

সুতরাং, দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধুনিক প্রযুক্তি মেট্রোরেলে- যা জাপানেও নেই দাবিতে যে তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচারিত হচ্ছে; তা আংশিক মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img