“হাসিনা বলতো ২০টা হুন্ডা, ১০টা গুন্ডা, নির্বাচন ঠাণ্ডা” শীর্ষক হাসনাত আবদুল্লাহর দাবিটি বিভ্রান্তিকর

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের ওপর জমা হওয়া আবেদনের ওপর ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) গত ২৪ আগস্টে শুনানিকালে ধাক্কাধাক্কি-হাতাহাতি-কিল-ঘুষির ঘটনা ঘটেছে। এতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মো. আতাউল্লাহর অভিযোগ, তিনিসহ তার দলের নেতা-কর্মীদের ওপরও হামলা হয়েছে। হামলা চালিয়েছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা ও তার সঙ্গে থাকা দলীয় নেতা-কর্মীরা। পরবর্তীতে এসব ঘটনার বিষয়ে সাংবাদিকের সাথে কথা বলার এক পর্যায়ে রুমিন ফারহানা বলেন, “আমি কোনো গুন্ডা-বদমাশের মেলা করিনি। করতে চাইলে করতে পারতাম। গুন্ডা আনতে চাইলে গুন্ডা আনা যায়। অসুবিধা হয় না”। এরই প্রেক্ষিতে সংবাদ সম্মেলনে রুমিন ফারহানার সমালোচনা করে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ এক পর্যায়ে দাবি করেন, “হাসিনা বলতো ২০টি হোন্ডা, ১০টি গুন্ডা, নির্বাচন ঠান্ডা।”

উক্ত দাবি সম্বলিত হাসনাত আবদুল্লাহর বক্তব্যের ভিডিও দেখুন এখানে, এখানে

এছাড়াও, পরবর্তীতে শেখ হাসিনার ‘১০ টি হোন্ডা, ২০ টি গুন্ডা, নির্বাচন ঠান্ডা’ বক্তব্যের ভিডিওও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, হাসনাত আবদুল্লাহর দাবিকৃত ‘২০ টি হোন্ডা, ১০ টি গুন্ডা, নির্বাচন ঠান্ডা’ শীর্ষক উক্তিটি শেখ হাসিনার নিজের নয়। প্রকৃতপক্ষে শেখ হাসিনা আলোচিত উক্তিটি মূলত বিএনপি, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সময়কালীন নির্বাচন ব্যবস্থাকে উদ্দেশ্য করে করেছিলেন।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের ওয়েবসাইটে ‘‘জিয়াউর রহমানের নীতি ছিল, ১০ হুন্ডা ২০ গুন্ডা নির্বাচন ঠান্ডা’’ শিরোনামে ২০১৯ সালের ৩০ নভেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, “নির্বাচন নিয়ে বিএনপি যে প্রশ্ন তোলে, তার সমালোচনা করেছেন (সাবেক) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আজকে বিএনপি নেতারা নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন, নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের আমি জিয়াউর রহমানের হ্যাঁ-না ভোট ও ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। কেমন নির্বাচন তারা করেছিল। সেখানে জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেনি। তাদের কথা-ই ছিল ১০টা হুন্ডা ২০টা গুন্ডা নির্বাচন ঠান্ডা। তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিল জেনারেল এরশাদও।’ শনিবার (৩০ নভেম্বর, ২০১৯) দুপুরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।”

এছাড়াও, অনুসন্ধানে ২০২১ সালের ২ ফেব্রুয়ারিতে মূলধারার গণমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি স্টার’ এর ওয়েবসাইটে ‘১০টা গুন্ডা, ২০টা হোন্ডা, নির্বাচন ঠান্ডা— সে পদ্ধতি এখন আর নেই: প্রধানমন্ত্রী’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, “বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যাদের গায়ে হাজার কালির ছিটা, তারা আবার এত বড় কথা বলে কোন মুখে?’ ‘সামরিক আমলে জনগণের ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল না। যেটা মিলিটারি শাসকেরা ঠিক করে দিত, সেটাই হতো। রেজাল্টও পরিবতন করা হতো। অতীতে ভোট চুরির অপরাধে সরকারপ্রধানকে পদত্যাগও করতে হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১০টা গুন্ডা, ২০টা হোন্ডা, নির্বাচন ঠান্ডা— সে পদ্ধতি এখন আর নেই। ইভিএমে ভোট কারচুপির সুযোগ নেই।”

এছাড়াও, সংবাদমাধ্যম ‘প্রতিদিনের বাংলাদেশ’ এর ইউটিউব চ্যানেলে ২০২২ সালের ২৪ ডিসেম্বরে প্রচারিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, “বাংলাদেশে নির্বাচন কী ছিল? নির্বাচন মানেই ছিল, আমরা যেটা বলতাম, ১০ টা হোন্ডা, ২০ টা গুন্ডা, নির্বাচন ঠান্ডা।” 

অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যম যমুনা টিভির ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবরে প্রচারিত আরেকটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওটিতে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, “..জনগণের ভোটাধিকার জনগণের হাতে আমরা ফিরিয়ে দিয়েছি। মিলিটারি ডিক্টেটর জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া, এদের সময়ে কেউ ভোট দিতে পারতো না। কথায়ই ছিল ১০ টা হোন্ডা, ২০ টা গুন্ডা, নির্বাচন ঠান্ডা। এখন আর সে অবস্থা নেই।..”

এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে আলোচিত উক্তিটি শেখ হাসিনার নয় বরং, শেখ হাসিনা প্রকৃতপক্ষে জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও খালেদা জিয়ার আমলের নির্বাচন ব্যবস্থার উদ্দেশ্যে উক্তিটি নানাসময়ে ব্যবহার করেছেন।

উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা মূলত ‘১০টি হোন্ডা, ২০ টি গুন্ডা, নির্বাচন ঠান্ডা’ বলে থাকলেও হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন ‘২০ টি হোন্ডা, ১০টি গুন্ডা, নির্বাচন ঠান্ডা।’

সুতরাং, এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর ‘হাসিনা বলতো ২০টি হোন্ডা, ১০টি গুন্ডা, নির্বাচন ঠান্ডা’ শীর্ষক দাবিটি বিভ্রান্তিকর।

তথ্যসূত্র

আরও পড়ুন

spot_img