বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে শিক্ষার্থীদেরকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিগ্রি প্রদান করার দাবিটি সত্য নয় 

সম্প্রতি, “দুর্ঘটনাক্রমে পাশ আইন অনুসারে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় আগুণে পুড়ে বা ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে গেলে অবিলম্বে সব শিক্ষার্থীকে গ্রয়াজুয়েট করতে হবে” শীর্ষক শিরোনামে একটি তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

২০২৩ সালে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানেএখানে
পোস্টগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে, এখানেএখানে

২০২২ সালে প্রচারিত দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানেএখানে
পোস্টগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানেএখানে

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে জানা যায়, দুর্ঘটনাক্রমে পাস বা Pass By Catastrophe কোনো সত্য আইন নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে এটি একটি শহুরে উপকথা যা বহু বছর ধরে প্রচলিত হয়ে আসা একটি গল্প কিংবা লোককাহিনী।

কি-ওয়ার্ড সার্চে, Academic.com নামক একটি ওয়েবসাইটে “Pass by catastrophe” শীর্ষক শিরোনামে একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। 

Screenshot from academic.com

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিপর্যয় পাস বলতে বেশ কিছু জনপ্রিয় শহুরে কল্পকাহিনীর প্রচলন রয়েছে। এই কল্পকাহিনীগুলোতে বলা হয় যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি কোনো বিশেষ বিপর্যয়মূলক ঘটনা ঘটে, তাহলে ছাত্রদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাসিং গ্রেড দেওয়া হবে।কারণ তাদের মূল্যায়ন করার কোনো উপায় থাকবে না। বিপর্যয়ের জন্য শাস্তি দেওয়া যাবে না। এই কল্পকাহিনীর সাধারণ উদাহরণগুলির মধ্যে রয়েছে:

* পরীক্ষার সময় কেউ মারা গেলে উপস্থিত অন্যান্য ছাত্রদের পাসিং গ্রেড দিয়ে দিতে হয়।
* যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয় পুড়ে যায় বা ধ্বংস হয়ে যায়, সমস্ত বর্তমান ছাত্ররা অবিলম্বে উচ্চতর দ্বিতীয় শ্রেণীর সম্মান সহ স্নাতক হয়।
* যদি একজন ছাত্র আত্মহত্যা করে, তবে তার রুমমেটরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঐ সেমিস্টারে পাস করে যাবে।

সাউথ আফ্রিকার অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘Sunday Times’ এ ৯ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে “Would you automatically get your degree if your varsity exploded?” শীর্ষক শিরোনামে একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

Screenshot from times live

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ইউনিভার্সিটি অফ কেপ টাউনের মুখপাত্র এলিজা মহোলোলার “pass by catastrophe” সম্পর্কে বলেছেন, “এটি নিঃসন্দেহে একটি শহুরে উপকথা। যাই ঘটুক না কেন, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তাদের ডিগ্রি অর্জন করতে হবে। যদি কোনও পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পরীক্ষা নিতে না পারে, তাহলে আমরা অন্য একটি সময় পুনঃনির্ধারণ করে তার পরীক্ষাটি নেবো।”

সানডে টাইমসকে স্টেলেনবোশ ইউনিভার্সিটির মুখপাত্র, মার্টিন ভিলজোয়েন বলেন, “বাস্তবতা হলো প্রতিটি পরিস্থিতিই মেধার ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে৷ যদি কোনও শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে বা এমনকি পরীক্ষার জায়গায় মারা যায় তবে তার বন্ধু এবং সহপাঠীদের অনুরোধ বিশ্ববিদ্যালয় বিবেচনা করবে৷ প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং পরিষেবাও দেবে।”

পরবর্তীতে, Salarship.com  নামক একটি ওয়েবসাইটে “Pass by Catastrophe: Reality or Myth?” শীর্ষক শিরোনামে একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

Screenshot from Salarship.com

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ““Pass by catastrophe” is a myth in which a catastrophic event occurs during the exam session of a school: a fire, an earthquake, etc. The legend states that in such conditions, the students taking the exams would automatically be awarded passing grades. This urban legend is partially true.”

যার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “‘বিপর্যয় পাস’ একটি মিথ যেখানে বলা হয় কোনো একটি বিদ্যালয়ে পরীক্ষা চলাকালীন সময় যদি আগুণ লাগা, ভূমিকম্প বা এরকম কোনো বিপর্যয় ঘটে তাহলে ঐ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বয়ঙ্গক্রিয়ভাবে ঐ পরীক্ষায় পাস করে যাবে। এই মিথটি আংশিক সত্য”। [এজাতীয় কোনো আইন নেই তবে কর্তৃপক্ষ চাইলে বিশেষ কোনো সুবিধা দিতে পারে যা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের উপর। সেই হিসেবে আংশিক সত্য়।]

Screenshot from Salarship.com

প্রতিবেদনটিতে বিপর্যয় পাসের বাস্তব কিছু উদাহরণ দেওয়া হয়েছে।

কুখ্যাত বোস্টন ম্যারাথন বোমা হামলার (এপ্রিল ১৫, ২০১৩) কারণে অনেক স্কুল ২০১৩ সালে চূড়ান্ত পরীক্ষা বাতিল করেছিল। এবং পরীক্ষা ছাড়াই শিক্ষার্থীদের গ্রেড গণনা করেছিলো। যে ছাত্র-ছাত্রীরা পরীক্ষার আগে ভালো পারফর্ম করেছে তারা পাস করেছে, আর যাদের ক্লাস পারফর্ম্যান্স ভালো ছিলো না তারা ফেইল করেছে।

একইভাবে করোনাকালীন সময়ে বাংলাদেশেও ‘বিপর্যয় পাস’ এর একটি উদাহরণ তৈরী হয়েছে। করোনাকালীন অস্থিরতার কারণে এইচএসসি ব্যাচ ২০২০ এর পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। পরিবর্তে জে এস সি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলের গড় করেই এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল নির্ধারণ করা হয়েছিলো।

মূলত, বিপর্যয় পাস’ একটি মিথ যেখানে বলা হয় কোনো একটি বিদ্যালয়ে পরীক্ষা চলাকালীন সময় যদি আগুণ লাগা, ভূমিকম্প বা এরকম কোনো বিপর্যয় ঘটে তাহলে ঐ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বয়ঙ্গক্রিয়ভাবে ঐ পরীক্ষায় পাস করে যাবে। এধরণের কোনো আইন নেই। তবে, বিপর্যয় ঘটলে বিপর্যয়ের গুরত্ব ও গভীরতা বিবেচনায় কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের শিক্ষার্থীদেরকে কিছু সুবিধা দিতে পারে, যা ঐ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। ‘বিপর্যয় পাস’ নামের কোনো আইন নেই যা মেনে চলতে প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য।

উলেক্ষ্য, Pass By Catastrophe বা বিপর্যয় পাসের এই মিথটি বেশী জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যখন এই মিথের কাহিনীর উপর ভিত্তি করে ১৯৯৮ সালে Dead man on campus ও Dead man’s curve নামে দুটি চলচ্চিত্র বানানো হয়।

প্রসঙ্গত, ২০২২ সালে এই দাবিটি ছড়িয়ে পড়লে Pass By Catastrophe বা বিপর্যয় পাসের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে একটি ফ্যাক্ট ফাইল প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রিউমর স্ক্যানার।

তথ্যসূত্র

RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img