বৃষ্টির জন্য দেরি করে আসায় এইচএসসি পরীক্ষা দিতে না পারা শিক্ষার্থীর আর্তনাদ শীর্ষক দাবিটি মিথ্যা

সম্প্রতি “এটা ঠিক হয়নি একদম।গতকালকে এইচ.এস.সি পরীক্ষার হলে বৃষ্টির জন্য ১০ মিনিট দেরি করে পৌঁছালে শিক্ষার্থীকে পরীক্ষা দিতে দেয়নি, স্কুল গেটে শিক্ষার্থীর আর্তনাদ।” শীর্ষক তথ্যসম্বলিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

ফেসবুকে প্রচারিত এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে। পোস্টগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে, এখানে  এবং এখানে

একই দাবিতে ইউটিউবে প্রচারিত এমন কিছু ভিডিও দেখুন এখানে এবং এখানে। পোস্টগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে এবং এখানে।

একই দাবিতে টিকটকে প্রচারিত এমন কিছু ভিডিও দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে।
পোস্টগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, বৃষ্টির জন্য দেরি করে আসায় এইচএসসি পরীক্ষা দিতে না পারা শিক্ষার্থীর আর্তনাদ শীর্ষক দাবিটি সঠিক নয় বরং গত ১৭ জুন রেলওয়ে সহকারী লোকোমোটিভ মাস্টারের নিয়োগ পরীক্ষায় একজন চাকরি প্রত্যাশীর আর্তনাদের ঘটনা এটি। 

কি-ওয়ার্ড এবং এডভান্স সার্চ পদ্ধতির মাধ্যমে দেশীয় কোনো গণমাধ্যমেই এ সংক্রান্ত কোনো খবর বা তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভিন্ন কোনো দাবিতে ভিডিওটি প্রকাশ হতে দেখেনি রিউমর স্ক্যানার।

ভিডিও বিশ্লেষণ কী বলছে?

ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ভিডিওতে এক নারীকে কোনো একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গেইটের সামনে কান্নাজড়িত কন্ঠে চিৎকার করতে দেখা যায়। উক্ত নারীকে ভিডিওতে বলতে শোনা যায়, “আমি মাত্র ১০ মিনিট পরে আসছিলাম। আমাকে পরীক্ষাটা দিতে দেন। দেখে দেখে মানুষের জীবন নষ্ট করে দিচ্ছেন আপনারা।” 

ওই নারীর পাশে ভেজা শার্ট ও লুঙ্গি পরিহিত একজন পুরুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এটি দেখে সেদিন বৃষ্টি হয়েছিল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে৷ 

আলোচিত ভিডিওটির ধারণকারী বা প্রথম প্রকাশকারীকে খুঁজে পায়নি রিউমর স্ক্যানার।

ঘটনাস্থল কোথায়?

ভিডিওটিতে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লাল এবং নীল রংয়ের একটি গেইট ধরে উক্ত নারীকে কান্নাজড়িত কন্ঠে আর্তনাদ করতে দেখা যায়। ভিডিওটিতে প্রতিষ্ঠানের নামফলক দেখা যায়নি। 

ভিডিওটি ঝাপসা হওয়ায় এবং নামফলক দেখা না যাওয়ায় রিভার্স এবং এডভান্সড সার্চ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

পরবর্তীতে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একই দাবিকৃত একটি ভিডিওতে একজনের কমেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়। 

কমেন্টে Badsha Alamgir নামে ঐ ব্যক্তি লিখেছেন, উক্ত স্থানটি হলো ‘সিদ্ধেশ্বরী সরকারি স্কুল এন্ড কলেজ, মালিবাগ।’ 

জনাব বাদশা আলমগীরের তথ্যের সূত্র ধরে কিওয়ার্ড সার্চ করে উক্ত নামে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুঁজে পায়নি রিউমর স্ক্যানার। তবে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চে ‘সিদ্ধেশ্বরী বালক উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ নামক একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যায়। উক্ত প্রতিষ্ঠানের মূল ফটকের (গেইট) ছবির সাথে আলোচিত ভিডিওর গেইটের হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়।  

অর্থাৎ, রাজধানীর রমনায় অবস্থিত সিদ্ধেশ্বরী বালক উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উক্ত ঘটনাটি ঘটেছে।

এটা কি এইচএসসি চলাকালীন ঘটনা?

আলোচিত ভিডিওটি চলমান এইচএসসি পরীক্ষার্থীর দাবিতেও ছড়িয়ে পড়তে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। 

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এমন কিছু পোস্ট দেখুন – এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।
পোস্টগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে। 

কিন্তু বিষয়টি সত্য নয়।

চলমান এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয় গত ৬ নভেম্বর। কিন্তু আলোচিত ভিডিওটি গত ২৭ অক্টোবরেও ফেসবুক প্রকাশিত (দেখুন এখানে, আর্কাইভ) হতে দেখা যায়। 

তাই, ভিডিওটি “কোনো এইচএসসি পরীক্ষার্থীর” এমন দাবিটিও সঠিক নয়। 

অনুসন্ধান কীভাবে এগোলো?

ঘটনার স্থান নিশ্চিত হওয়ার পর মূল ঘটনা জানতে এ বিষয়ে অধিকতর অনুসন্ধান শুরু করে রিউমর স্ক্যানার টিম। এক্ষেত্রে তথ্যসূত্র হিসেবে কাজে আসে জনাব বাদশা আলমগীরের কমেন্টটি। 

জনাব আলমগীর আলোচিত ভিডিওটি সম্বলিত একটি পোস্টের কমেন্টে লিখেন, “এটা আমার নিজের চোখে দেখা ঘটনা৷ বাংলাদেশ রেলওয়ের সরকারি পরীক্ষা ছিল। কোনো স্কুল বা কলেজ পরিক্ষা ছিল না”।  

এই কমেন্টে দুইটি তথ্য ছিল-

১/ জনাব আলমগীরের নিজের চোখে দেখা ঘটনা। 
২/ বাংলাদেশ রেলওয়ের সরকারি পরীক্ষা।

অর্থাৎ, তিনি প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন এই ঘটনায়। সার্বিক বিষয়ে জানতে তাই তার সাথে যোগাযোগ করে রিউমর স্ক্যানার টিম।

বাদশা আলমগীর রিউমর স্ক্যানারকে জানান, ঘটনাটি সম্ভবত ২৩ বা ২৪ জুলাই ঘটেছে। তার ছোট ভাইয়ের পরীক্ষা থাকায় তিনিও উপস্থিত ছিলেন সেখানে। তিনি তার মোবাইলে ধারণকৃত একই ঘটনার দুইটি ভিডিও রিউমর স্ক্যানারকে পাঠান। ভিডিওগুলোতেও একই ঘটনা দেখা যায়। 

জনাব আলমগীর জানান, ঐ দিন (২৩ বা ২৪ জুলাই) রেলওয়ের সহকারী লোকোমোটিভ মাস্টারের নিয়োগ পরীক্ষা ছিল।

তবে কিওয়ার্ড সার্চে ঐ সময়ে রেলওয়ের এমন কোনো নিয়োগ পরীক্ষা হওয়ার ব্যাপারে তথ্য পায়নি রিউমর স্ক্যানার টিম। 

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জনাব আলমগীরের উল্লিখিত রেলওয়ের পদটিতে গত ১৭ জুন পরীক্ষা হয়েছিল। 

এ বিষয়টি জনাব আলমগীরকে জানালে তিনি পরবর্তীতে তার ছোট ভাই থেকে জেনে রিউমর স্ক্যানারকে নিশ্চিত করেন, এটিই ছিল সেই পরীক্ষা। 

পরবর্তীতে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃক গত ৮ জুন প্রকাশিত সহকারী লোকোমোটিভ মাস্টারের নিয়োগ পরীক্ষার কেন্দ্র তালিকাতে সিদ্ধেশ্বরী বালক উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নাম খুঁজে পাওয়া যায়৷ 

সিদ্ধেশ্বরী কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ

আলোচিত ভিডিওটির ঘটনাস্থল সিদ্ধেশ্বরী বালক উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শামস উদ্দীনের সাথে যোগাযোগ করে রিউমর স্ক্যানার টিম। 

জনাব শামস উদ্দীনও রিউমর স্ক্যানারকে নিশ্চিত করেন, “এই পরীক্ষা টি রেলওয়ের  সহকারী লোকোমোটিভ মাস্টার পদের লিখিত এমসিকিউ নিয়োগ পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষা শুরুর আধা ঘন্টা পর মেয়েটি এসে প্রতিষ্ঠানের গেইটের বাহিরে কান্নাকাটি করে।”

বিষয়টি কি অমানবিক ছিল?

গত ৮ জুন বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সহকারী লোকোমোটিভ মাস্টারের নিয়োগ পরীক্ষার যে কেন্দ্র তালিকা প্রকাশ করেছিল, সেই তালিকার শেষে কিছু জরুরি নির্দেশনা উল্লেখ করা হয়৷ 

একটি নির্দেশনা ছিল এমন, পরীক্ষার্থীগণ পরীক্ষা শুরুর নূন্যতম ৩০ মিনিট পূর্বে নির্ধারিত কেন্দ্রের নির্ধারিত কক্ষে আসন গ্রহণ করবেন। সকাল ১০টার পর কোনো প্রার্থী কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবে না।”

কিন্তু আলোচিত ভিডিওটিতে উক্ত নারীকে বলতে শোনা যায়, তিনি দশ মিনিট দেরি করে পৌঁছেছিলেন। তাই তাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। 

এ বিষয়ে সিদ্ধেশ্বরী বালক উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ জনাব শামস উদ্দীন রিউমর স্ক্যানারকে বলছিলেন, “নিয়োগ পরীক্ষাটি এক ঘন্টা সময়ের ছিল এবং রেলওয়ের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ভিতরে অবস্থান করেছিল। রেলওয়ের এই কেন্দ্রের দায়িত্বরত কর্মকর্তার নির্দেশে প্রতিষ্ঠানের গেইটের দারোয়ান গেইট খুলেনি। যেহেতু এটি একটি প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ পরীক্ষা তাই, বিধি-মোতাবেক ঐ মেয়েটিকে আধা ঘন্টা পর ঢুকতে দেয়া যায় না।” 

অর্থাৎ, উক্ত ঘটনাতে রেলওয়ের নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটেনি বলেই প্রতীয়মান হয়। 

কিন্তু এই ঘটনাকে শিক্ষার্থীর আর্তনাদ দাবি করে তার প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট স্কুলটিকে দায়ী করে অসংখ্য সমালোচনামূলক কমেন্ট চোখে পড়েছে রিউমর স্ক্যানার টিমের। 

এ সংক্রান্ত একটি পোস্টের কিছু কমেন্ট দেখুন 

এ ব্যাপারে সিদ্ধেশ্বরী বালক উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ জনাব শামস উদ্দীন রিউমর স্ক্যানারকে বলছিলেন, তারা এ বিষয়টি নিয়ে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আছেন। তারা এজন্য মামলা করবেন বলেও ভেবেছিলেন।

জনাব শামস উদ্দীন রিউমর স্ক্যানারকে জানান, “সব ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়ে এইসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করা আইনের দৃষ্টিতে কতটুকু যুক্তি-যুক্ত সেটি বিবেচনা করা উচিত।”

মূলত, গত ১৭ জুন রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে রেলওয়ে সহকারী লোকোমোটিভ মাস্টারের এমসিকিউ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে দেরিতে পৌঁছানোয় এক চাকরি প্রত্যাশী পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষা হলে ঢুকতে দেয়নি কর্তৃপক্ষ। ওই ঘটনায় ধারণকৃত ভিডিওকেই বৃষ্টির কারণে এইচএসসি পরীক্ষার হলে ১০ মিনিট দেরিতে পৌঁছানোর কারনে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ কর্তৃক হলে প্রবেশ করতে না দেওয়ার ঘটনার ভিডিও দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।

সুতরাং, বৃষ্টির জন্য দেরি করে আসায় এইচএসসি পরীক্ষা দিতে না পারা শিক্ষার্থীর আর্তনাদ শীর্ষক দাবিটি মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

  • Badsha Alamgir : Eye witness Statement 
  • Mohammad Shams Uddin: Principle, Siddheswari Boys Higher Secondary School Statement
  • Rumor Scanner Analysis
RS Team
RS Team
Rumor Scanner Fact-Check Team
- Advertisment -spot_img
spot_img
spot_img