চলতি বছরের নভেম্বর মাসে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৪৫০টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। রিউমর স্ক্যানারের ইতিহাসে একক মাস হিসেবে যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভুল তথ্য শনাক্তের সংখ্যা। রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে ৩৯৪টি প্রতিবেদনের মাধ্যমে এসব ভুল তথ্যের ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্লেষণ বলছে, নভেম্বরে রাজনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি (৩০৫) ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে, যা মোট ভুল তথ্যের প্রায় ৬৮ শতাংশ। এছাড়া জাতীয় বিষয়ে ৬০টি, পরিবেশ-জলবায়ু বিষয়ে ৪৩টি, বিনোদন বিষয়ে ৮টি, ধর্মীয় বিষয়ে ৪টি, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ২২টি, খেলাধুলা বিষয় ৪টি এবং শিক্ষা বিষয়ে ১টি ও প্রতারণা বিষয়ে ৩টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে গত মাসে।
নভেম্বরে শনাক্তকৃত ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব ঘটনায় ভিডিও কেন্দ্রিক ভুলই ছিল সবচেয়ে বেশি, ২৩০টি। এছাড়া তথ্য কেন্দ্রিক ভুল ছিল ১৫২টি এবং ছবি কেন্দ্রিক ভুল ছিল ৬৮টি। শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলোর মধ্যে মিথ্যা হিসেবে ৩৬৪টি, বিকৃত হিসেবে ৪৬টি, বিভ্রান্তিকর হিসেবে ৩৯টি ও আংশিক সত্য হিসেবে ১টি ঘটনাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে পুরুষদের জড়িয়ে ভুল তথ্য প্রচার হয়েছে ২২০টি এবং নারীদের জড়িয়ে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ৯৩টি।
একই সময়ে বয়সের ধরণ অনুযায়ী চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে ভুল তথ্যগুলোকে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ে প্রবীণদের (যাদের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি) জড়িয়ে সবচেয়ে বেশি (১৪২) ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এছাড়া, শিশুদের (যাদের বয়স ০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে) জড়িয়ে ৫টি, যুবদের (যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে) জড়িয়ে ৭১টি এবং মধ্য বয়সীদের (যাদের বয়স ৩৬ থেকে ৫৯ বছরের মধ্যে) জড়িয়ে ৯০টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
প্লাটফর্ম হিসেবে গেল মাসে ফেসবু্কে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে, সংখ্যার হিসেবে যা ৪০০টি। এছাড়া ইনস্টাগ্রামে ১৪৮টি, টিকটকে ১১০টি, ইউটিউবে ৪২টি, এক্সে ২১টি, থ্রেডসে অন্তত ১৬টি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। ভুল তথ্য প্রচারের তালিকা থেকে বাদ যায়নি দেশের গণমাধ্যমও। ১৭টি ঘটনায় দেশের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার হতে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। বাংলাদেশকে জড়িয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমেে গত মাসে অপতথ্য প্রচারের পরিমাণ ছিল ৫টি।
বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের বিষয়টি গেল বেশ কয়েক মাস ধরে আলোচনায়। নভেম্বরে ৭টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে ৬টি ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশি পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
রিউমর স্ক্যানার টিমের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, নভেম্বরে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে জড়িয়ে নয়টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। ভুলতথ্যগুলোর ধরণ বুঝতে এগুলোকে রিউমর স্ক্যানার দুইটি আলাদা ভাগে ভাগ করেছে৷ সরকারের পক্ষে যায় এমন ভুল তথ্যের প্রচারকে ইতিবাচক এবং বিপক্ষে যায় এমন ভুলতথ্যের প্রচারকে নেতিবাচক হিসেবে ধরে নিয়ে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এসব ভুলতথ্যের সবগুলোতেই সরকারকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
নভেম্বর মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে ২৫টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসব ভুলতথ্যের প্রায় ৯৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সরকারের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে জড়িয়ে দুইটি এবং জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আ ফ ম খালিদ হোসেন, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও ফরিদা আখতারকে জড়িয়ে প্রচার হওয়া একটি করে ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়া, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমকে জড়িয়ে পাঁচটি এবং উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদারকে জড়িয়ে একটি করে ভল তথ্য প্রচার হতে দেখা গেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে সর্বত্র। গেল বেশ কয়েক মাসে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অপতথ্যের প্রচার বৃদ্ধি পেয়েছে। নভেম্বরে এ সংক্রান্ত ৮১টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যা এ বছর বিগত মাসগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ শনাক্তের সংখ্যা।
রিউমর স্ক্যানার নভেম্বর মাসের ফ্যাক্টচেকগুলো বিশ্লেষণে দেখেছে, এই সময়ে সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য (১১৯টি) প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে বিএনপিকে জড়িয়ে ৪৮টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৯৪ শতাংশই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এছাড়া, দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জড়িয়ে এই সময়ে ১১টি অপতথ্য (সবগুলোতেই নেতিবাচক উপস্থাপন) প্রচার করা হয়েছে। এই সময়ে ছাত্রদলকে জড়িয়ে পাঁচটি ও যুবদলকে জড়িয়ে একটি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
বিএনপির পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে সবচেয়ে বেশি (৮৪টি) অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতকে জড়িয়ে ৪৮টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসবের প্রায় ৭৭ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এ সময়ে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে ছয়টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার সবগুলোতেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
জামায়াতের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে এই সময়ে ১৪টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
এছাড়া, নভেম্বর মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও দলটির নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ২৮টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে দল হিসেবে এনসিপিকে জড়িয়ে সাতটি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৮৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গ-ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের নিয়ে নভেম্বরে ১৫৬টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে জড়িয়ে ৮৬টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে যার প্রায় ৯৩ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটির পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে এই সময়ে ৩৪টি অপতথ্য (৯৪ শতাংশই ইতিবাচক) প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়া দলটির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে জড়িয়ে এ মাসে ১৯টি এবং যুবলীগকে জড়িয়ে ৩টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে।
ভুল তথ্যের রোষানল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোও। নভেম্বরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে জড়িয়ে নয়টিসহ এই বাহিনীকে নিয়ে ২৩টি ভুল তথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশকে জড়িয়ে ১৩টি, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে জড়িয়ে দুইটি করে এবং র্যাব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীকে জড়িয়ে একটি করে ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
নভেম্বরে শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে ৭৪টি। এর মধ্যে ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে ১৭টি।
নভেম্বর মাসে তিনটি ঘটনা বা ইস্যুতে ভুল তথ্যের প্রচার ছিল। এর মধ্যে ১৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগের লকডাউনকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ সংখ্যক (৭৮টি) ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া, শেখ হাসিনার রায় ইস্যুতে ২৪টি, ভূমিকম্প ইস্যুতে ৪১টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
গণমাধ্যমের নাম, লোগো, শিরোনাম এবং নকল ও ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে ভুল তথ্য প্রচারের পরিমাণ আবার বৃদ্ধি পেতে দেখা যাচ্ছে৷ নভেম্বর মাসে এই পদ্ধতির ব্যবহার করে ৮৭টি ঘটনায় দেশ-বিদেশি ২৭টি সংবাদমাধ্যমকে জড়িয়ে ৯৩টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
বার্তা প্রেরক
তানভীর মাহতাব আবীর
সিনিয়র ফ্যাক্টচেকার,
রিউমর স্ক্যানার বাংলাদেশ।
[email protected]





