গেল ডিসেম্বরে (২০২৫) ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৫২১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। রিউমর স্ক্যানারের ইতিহাসে একক মাস হিসেবে যা সর্বোচ্চ ভুল তথ্য শনাক্তের সংখ্যা। রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে ৪৪৭টি প্রতিবেদনের মাধ্যমে এসব ভুল তথ্যের ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্লেষণ বলছে, ডিসেম্বরে রাজনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি (৪৪৬) ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে, যা মোট ভুল তথ্যের প্রায় ৮৬ শতাংশ। এছাড়া জাতীয় বিষয়ে ৩৫টি, বিনোদন বিষয়ে ৫টি, ধর্মীয় বিষয়ে ১৩টি, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ১৬টি এবং শিক্ষা ও প্রতারণা বিষয়ে দুইটি করে ও অন্যান্য বিষয়ে দুইটি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে গত মাসে। নিয়মিত ফ্যাক্টচেক ছাড়াও একটি গবেষণা, তিনটি ফ্যাক্ট স্টোরি এবং একটি ফ্যাক্ট ফাইল প্রকাশিত হয়েছে ডিসেম্বরে।
ডিসেম্বরে শনাক্তকৃত ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব ঘটনায় তথ্য কেন্দ্রিক ভুলই ছিল সবচেয়ে বেশি, ২৮৭টি। এছাড়া ভিডিও কেন্দ্রিক ভুল ছিল ১৩৬টি এবং ছবি কেন্দ্রিক ভুল ছিল ৯৮টি। শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলোর মধ্যে মিথ্যা হিসেবে ৩৮৮টি, বিকৃত হিসেবে ৮৯টি, বিভ্রান্তিকর হিসেবে ৪১টি, আংশিক মিথ্যা হিসেবে ২টি এবং আংশিক সত্য হিসেবে ১টি ঘটনাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে পুরুষদের জড়িয়ে ভুল তথ্য প্রচার হয়েছে ৪০৮টি এবং নারীদের জড়িয়ে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ১৬৮টি।
একই সময়ে বয়সের ধরণ অনুযায়ী চারটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে ভুল তথ্যগুলোকে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ে যুবদের (যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে) জড়িয়ে সবচেয়ে বেশি (২৭৩) ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
এছাড়া, শিশুদের (যাদের বয়স ০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে) জড়িয়ে আটটি, মধ্য বয়সীদের (যাদের বয়স ৩৬ থেকে ৫৯ বছরের মধ্যে) জড়িয়ে ১২৩টি এবং প্রবীণদের (যাদের বয়স ৬০ বছর বা তার বেশি) জড়িয়ে ২৬৮টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
প্লাটফর্ম হিসেবে গেল মাসে ফেসবু্কে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে, সংখ্যার হিসেবে যা ৪৭৫টি। এছাড়া ইনস্টাগ্রামে ১৩৬টি, টিকটকে ৯৬টি, ইউটিউবে ৫৭টি, এক্সে ৪২টি, থ্রেডসে অন্তত ১৬টি এবং লিংকডইনে দুইটি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। ভুল তথ্য প্রচারের তালিকা থেকে বাদ যায়নি দেশের গণমাধ্যমও। ২০টি ঘটনায় দেশের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার হতে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। একই সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশকে জড়িয়ে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে দুইটি।
বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের বিষয়টি গেল বেশ কয়েক মাস ধরে আলোচনায়। ডিসেম্বরে ছয়টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে পাঁচটিতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভারতীয় পরিচয়ধারী অ্যাকাউন্ট ও পেজ থেকে অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
রিউমর স্ক্যানার টিমের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ডিসেম্বরে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে জড়িয়ে সাতটি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। ভুলতথ্যগুলোর ধরণ বুঝতে এগুলোকে রিউমর স্ক্যানার দুইটি আলাদা ভাগে ভাগ করেছে৷ সরকারের পক্ষে যায় এমন ভুল তথ্যের প্রচারকে ইতিবাচক এবং বিপক্ষে যায় এমন ভুলতথ্যের প্রচারকে নেতিবাচক হিসেবে ধরে নিয়ে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এসব ভুলতথ্যের প্রায় ৮৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই সরকারকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ডিসেম্বর মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে ১৫টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসব ভুলতথ্যের সবগুলোতেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে সর্বত্র। গেল বেশ কয়েক মাসে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অপতথ্যের প্রচার বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিসেম্বরে এ সংক্রান্ত ১১০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
রিউমর স্ক্যানার ডিসেম্বর মাসের ফ্যাক্টচেকগুলো বিশ্লেষণে দেখেছে, এই সময়ে সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য (২১৪টি) প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে বিএনপিকে জড়িয়ে ৩৩টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৮৮ শতাংশই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এছাড়া, দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জড়িয়ে এই সময়ে ৬৮টি অপতথ্য (৬৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক উপস্থাপন) প্রচার করা হয়েছে। এই সময়ে ছাত্রদলকে জড়িয়ে একটি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
বিএনপির পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, তার অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে সবচেয়ে বেশি (১৭৫টি) অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতকে জড়িয়ে ৬২টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসবের প্রায় ৮৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এ সময়ে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে ২১টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
জামায়াতের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে এই সময়ে ৩২টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।
এছাড়া, ডিসেম্বর মাসে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও দলটির নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ৩৮টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে দল হিসেবে এনসিপিকে জড়িয়ে আটটি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার সবগুলোতেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এই সময়ে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জড়িয়ে পাঁচটি অপতথ্য (সবগুলোতেই নেতিবাচক উপস্থাপন) শনাক্ত হয়েছে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গ-ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের নিয়ে ডিসেম্বরে ১৫৪টি অপতথ্যের প্রচার করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে জড়িয়ে ৩৯টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে যার প্রায় ৮৭ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটির পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনাকে জড়িয়ে এই সময়ে ৫২টি অপতথ্য (প্রায় ৯৪ শতাংশই ইতিবাচক) প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়া দলটির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে জড়িয়ে গত মাসে ১৯টি এবং যুবলীগকে জড়িয়ে চারটি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে।
ভুল তথ্যের রোষানল থেকে রক্ষা পাচ্ছে না রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোও। ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে জড়িয়ে চারটিসহ এই বাহিনীকে নিয়ে ১৮টি ভুল তথ্যের প্রচার দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশকে জড়িয়ে ১৯টি এবং র্যাব ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে জড়িয়ে দুইটি করে ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
ডিসেম্বরে শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে ১০৩টি। এর মধ্যে ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে ১০টি।
ডিসেম্বর মাসে ছয়টি ঘটনা বা ইস্যুতে ভুল তথ্যের প্রচার ছিল। এর মধ্যে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকান্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ সংখ্যক (১০৯টি) ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া, তারেক রহমানের দেশে ফেরা ইস্যুতে ৩৪টি, খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ইস্যুতে ২০টি, বিজয় দিবস ইস্যুতে ১২টি, খালেদা জিয়ার মৃত্যু ইস্যুতে ৫টি এবং ময়মনসিংহে দীপু দাস হত্যা ইস্যুতে ২টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।
গণমাধ্যমের নাম, লোগো, শিরোনাম এবং নকল ও ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে ভুল তথ্য প্রচারের পরিমাণ আবার বৃদ্ধি পেতে দেখা যাচ্ছে৷ ডিসেম্বর মাসে এই পদ্ধতির ব্যবহার করে ১৫৯টি ঘটনায় দেশ-বিদেশি ৩২টি সংবাদমাধ্যমকে জড়িয়ে ১৭৮টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
বার্তা প্রেরক
তানভীর মাহতাব আবীর
সিনিয়র ফ্যাক্টচেকার,
রিউমর স্ক্যানার বাংলাদেশ।
[email protected]





