“বিডিআর হত্যাকান্ড নিয়ে একটি চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধান উঠে এসেছে। আওয়ামী লীগ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগেই এই ঘটনাটি ঘটানো হয়েছিল। পিলখানায় সেই বর্বরতার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও ভারত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। তারা বাংলাদেশকে পঙ্গু করে স্বার্থ হাসিল করেছিল।” বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পোশাকে একজন ব্যক্তি ডায়াসের পেছনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের সামনে এই বক্তব্য দিচ্ছেন এমন একটি ভিডিও প্রচার হচ্ছে ফেসবুকে।

‘Rony Globe’ নামের একটি প্রোফাইল থেকে গত ০১ ডিসেম্বর সকালে ১৫ সেকেন্ডের এই কনটেন্টটি আপলোড করার পর এই প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত ভিডিওটি দেখা হয়েছে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক বার। কনটেন্ট এনগেজমেন্ট বিশ্লেষণে আরো দেখা যাচ্ছে, ভিডিওতে লাইক রিয়েক্ট পড়েছে ১০ হাজারের অধিক। শেয়ার হয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি এবং ভিডিওতে মন্তব্য এসেছে আড়াই শতাধিক। মন্তব্যগুলোতে বক্তব্যটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
এই প্রোফাইলেই আরেকটি ভিডিও আপলোড করা হয়েছে ০৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়। ২২ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের এই ভিডিওতেও একজন সেনাসদস্যের পোশাকে এক ব্যক্তিকে সংবাদ সম্মেলনে বলতে দেখা যায়, “পিলখানায় বিডিআর হত্যাকান্ডে আওয়ামী লীগ ও ভারতের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। ভারতের মদদে দেশের সামরিক বাহিনীকে পঙ্গু করা হয়েছিল। ভারতকে জবাব দিতে হবে এমন ষড়যন্ত্রে কেন তারা জড়ালো আর আওয়ামী লীগকে শায়েস্তা করতে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে এবং এই ট্রাজেডির মাধ্যমে যে কালপ্রিটরা দেশের এত সামরিক অফিসারদের হত্যা করলো তাদের বিচার নিশ্চিত না করা অব্দি আমরা থামবো না।”

ভিডিওটি দেখা হয়েছে ১ লক্ষ ২২ হাজারের অধিক বার। অপর ভিডিওটির মতো এই কনটেন্টটিও সাত হাজারের অধিক রিয়েক্ট, সাড়ে তিন হাজার শেয়ার এবং আড়াই শতাধিক মন্তব্য নিয়ে বেশ ভাইরাল।
কিন্তু হঠাৎ বিডিআর হত্যাকান্ড নিয়ে সেনাসদস্যরা রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করে আলোচনা করছে কেন? এর উত্তর হচ্ছে গত ৩০ নভেম্বর বিডিআর বিদ্রোহে সংঘটিত বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ তদন্তের জন্য গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দলগতভাবে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা পাওয়ার কথা জানায় জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন। তারা বলছে, এ ঘটনার মূল সমন্বয়কারী ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস। পুরো ঘটনাটি সংঘটিত করার ক্ষেত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল। এ ছাড়া এই ঘটনায় ভারতেরও সম্পৃক্ততা পেয়েছে বলে জানায় কমিশন।
এই ঘটনার পরদিন সেনাসদস্যের মন্তব্য দাবির প্রথম এবং এর প্রায় আড়াই দিন পর দ্বিতীয় ভিডিও প্রচার হয় রনি গ্লোব নামের প্রোফাইলে।
কিন্তু আলোচিত প্রতিবেদন জমা পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে কোনো মন্তব্য করার তথ্য মেলেনি গণমাধ্যমে। এমনকি বাহিনীটির যে মুখপাত্র প্রতিষ্ঠান, সেই আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) ওয়েবসাইটেও এমন কোনো সংবাদ বিজ্ঞপ্তির অস্তিত্ব মেলেনি যাতে এই প্রতিবেদন নিয়ে বাহিনীর মন্তব্য আছে।
পরবর্তীতে ভাইরাল ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার নিশ্চিত হয় যে দু’টি ভিডিওই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
দুইটি ভিডিওতেই ‘AI Info’ সতর্ক বার্তা দেওয়া আছে। যদিও এখন বাস্তব অনেক ছবি-ভিডিওতেও একই সতর্কবার্তার অপশনটি চালু রাখেন নেটিজেনরা। এটির ব্যবহার নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে। একটি ভিডিওর নিচে ডান কোণে লাল রং দিয়ে ভিডিওর কোনো উপাদান ঢেকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। গুগলের ভিইও থ্রি দিয়ে কোনো ভিডিও তৈরি করলে সাধারণ এই একই স্থানে veo লেখা থাকে। এখানেও একই লেখা ছিল বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

তাছাড়া, ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করে এর বেশ কিছু উপাদানেও অসঙ্গতি পাওয়া যাচ্ছে। যেমন, একটি ভিডিওতে নামের ব্যাজের জায়গাটা ফাঁকা, নাম উল্লেখ নেই। আরেকটিতে নাম থাকলেও ভাষা অস্পষ্ট। দুইটি ভিডিওতেই ডায়াসের ওপর যেসব গণমাধ্যমের বুম রাখা আছে সেগুলোর একাধিক বুমে থাকা লোগোর ডিজাইন সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের লোগোর সাথে মিল নেই। তাছাড়া, দুইটি ভিডিওতেই একই ভবনের সামনের দৃশ্য দেখা গেলেও একটিতে ভবনের পরিচয় ইংরেজিতে ‘Army Headquarter’ লেখা থাকলেও অন্যটিতে উক্ত অংশ ফাঁকা দেখা যায়। এর পরিবর্তে অপর ভিডিওতে বাংলায় ‘সেনাস..’ লেখা দেখা যায়।
ভিডিও দুইটি এআই দিয়ে তৈরি কিনা তা জানতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল ‘ডিপফেক-ও-মিটার’সহ একাধিক টুল ব্যবহার করে এটি এআই দিয়ে তৈরির কমপক্ষে ৯০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত সম্ভাবনা আছে বলে জানা গেছে।
ভিডিও দুটি যে বাস্তব নয় তা অবশ্য ভিডিওর স্ক্রিনের একটি বাক্য থেকেও স্পষ্ট। দু’টি ভিডিওতেই স্ক্রিনে ‘সেনাবাহিনী যে কথা বলতে পারেনি’ লেখা দেখা গেছে।

অর্থাৎ, ভিডিওগুলো যে কাল্পনিক তা ভিডিওর ক্রিয়েটরই বুঝিয়ে দিয়েছেন। তবে এরপরও ভিডিওটি বাস্তব বলে বিশ্বাস করেছেন এমন মানুষের সংখ্যাও যে নেহায়েত কম নয় তা ভিডিও দু’টির বিপুল পরিমাণ এনগেজমেন্ট থেকেই স্পষ্ট।
রনি গ্লোব নামের ফেসবুক প্রোফাইলটি চলতি বছরের ০৪ সেপ্টেম্বর খোলা হয়। বাংলাদেশ থেকেই একজন এডমিন প্রোফাইলটি পরিচালনা করছেন। প্রোফাইলটিতে নিয়মিতই বিভিন্ন ঘটনাকে উদ্দেশ্য করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে। একই নামে দেড় বছর আগে খোলা একটি টিকটক অ্যাকাউন্টও রয়েছে। এটিতেও এআই ভিডিও আপলোড করা হচ্ছে।





