বুধবার, জানুয়ারি 14, 2026

ওসমান হাদিকে গুলি: সময়ে সময়ে সন্দেহের তীর ছুটেছে নানা জনের দিকে

১২ ডিসেম্বর শুক্রবার জুম্মার নামাজের ঠিক পরপরই খবর আসে ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি রাজধানীর বিজয়নগরে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় তাকে গুলি করা হয়। সে সময় শ্রমিক অধিকার পরিষদ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের প্রচার সম্পাদক রাহিম পাটোয়ারির একটি ফেসবুক লাইভে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাদির প্রথম প্রকাশ্য ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়। 

Screenshot: Facebook 

ফুটেজে দেখা যাচ্ছিল, গুরুতর আহত অবস্থায় হাদিকে ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। 

শরিফ ওসমান হাদিকে এমন এক সময়ে গুলি করা হয়, যখন বাংলাদেশ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। এর আগের দিন সন্ধ্যায়ই ঘোষণা করা হয় নির্বাচনের তফসিল, যা থেকে জানা যায় যে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি মনস্থির করার পর হাদি গেল কয়েক মাস ধরেই ঢাকা-৮ আসনের এলাকাগুলোয় চষে বেড়াচ্ছিলেন, ছুটছিলেন মানুষ থেকে মানুষের কাছে, দিচ্ছিলেন প্রতিশ্রুতি আর অঙ্গিকারের বার্তা। এই আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তার ওপর তফসিল ঘোষণার পরপরই প্রাণঘাতী এই আঘাত আলোড়ন তুলে চারদিকে। কে, কী উদ্দেশ্যে তাকে গুলি করল তা হয়ে উঠে বড় প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে রিউমর স্ক্যানারও নজর রাখছিল এই ইস্যুর ঘটনাপ্রবাহগুলোয়। 

ঘটনার পর সেদিন দুপুর তিনটার দিকে ‘Daily Ajker Kantho’ নামের একটি ফেসবুক পেজের পোস্টে দাবি করা হয়, মির্জা আব্বাসের নির্দেশে গুলি করা হয় ওসমান হাদিকে। আজকের কণ্ঠ পেজটি গেল বেশ কয়েক মাস ধরেই অপতথ্য ছড়ানোর জন্য ফ্যাক্টচেকারদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিল। ফলে ঘটনা ঘটার এত কম সময়ের মধ্যে ঘটনার নেপথ্যের ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য প্রকাশ্যে নিয়ে আসা অস্বাভাবিক নয় পেজটির জন্য। 

এই ঘটনার ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই ঘটনাস্থলের আশেপাশে থাকা কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ (, ) প্রকাশ্যে আসে। যাতে দেখা যায়, একটি মোটর সাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি দ্রুতগতিতে হাদিকে গুলি করে পালিয়ে যান। সাংবাদিক ইসরাফিল ফরায়েজী সেদিন বিকেল সাড়ে চারটায় তিনটি ছবি প্রকাশ করে এদের খুঁজে বের করার আহ্বান জানান। তখনই প্রথম জানা যায় যে, হাদির নির্বাচনী প্রচারণাতে থাকা এই ব্যক্তিকে সন্দেহ করা হচ্ছে এই ঘটনার আততায়ী হিসেবে। মাস্ক পরা থাকায় এই ব্যক্তির পুরো চেহারা দেখা যাচ্ছিল না ছবিতে। 

Screenshot: Facebook 

১২ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম তার এক ফেসবুক পোস্টে এক ব্যক্তির ছবি দিয়ে জানতে চান, হাদির রিক্সার পাশ দিয়ে যাওয়া বাইকের আরোহীদের ছবির সাথে এই ব্যক্তির মিল পাওয়া যায় কিনা। ছবিটি রিভার্স সার্চ করে রিউমর স্ক্যানার দেখে, গত ২৩ আগস্ট মাগুরায় বিদেশি পিস্তলসহ বায়েজিদ বোস্তামী নামের জামায়াত ইসলামীর এক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। ছবিটি তারই। প্রতিবেদনে মাগুরা পুলিশ সুপার মিনা মাহমুদার বরাত দিয়ে বলা হয়, “সব দলের সাথেই বায়েজিদের সম্পর্ক ছিল বলে জানা গেছে। ৫ আগস্টের আগে সে আওয়ামী লীগে ছিল। পরে বিএনপিতে যোগ দেয়, এখন জামায়াতকে ফলো করে বলে আমাদের কাছে খবর রয়েছে।”

Comparison: Rumor Scanner 

সেদিন (১২ ডিসেম্বর) কাছাকাছি সময়ে আরেকটি পোস্ট বেশ ভাইরাল হয়। এক তরুণের ছবি পোস্ট করে পোস্টে বলা হয়৷ তার নাম ইফাজ, বাড়ি ভোলা। দাবি করা হয়, সে হাদিকে গুলি করেছে। রিউমর স্ক্যানার তাৎক্ষণিকভাবেই ইফাজ নামের এই তরুণের ফেসবুক প্রোফাইল খুঁজে বের করে। প্রোফাইল অনুযায়ী আওয়ামী রাজনীতির সমর্থক এই তরুণকে সেদিন রাতেও ফেসবুক এক্টিভ পাওয়া যায়। সে একটি স্টোরিও দেয়। 

Screenshot collage: Rumor Scanner 

এক পর্যায়ে তার একটি ভিডিও প্রকাশ্যে আসে, যাতে তাকে এ বিষয়ে আলাপ করতে দেখা যায়। ইফাজ জানান, মানুষ তাকে নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে।

১২ ডিসেম্বর রাত দশটার কিছু পরে ‘চ্যানেল ওয়ান’-এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি রিফাত রিসান ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করে জানান, ঢাকা মেডিকেলে তিনি হামলার শিকার হয়েছেন। ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংবাদ সংগ্রহের জন্য যান। ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘ফুটেজ নেওয়া অবস্থায় আচমকা কয়েকজন এসে কোনো কথা ছাড়াই আমাকে ধাক্কা দিতে দিতে ‘আমি হাদিকে গুলি করেছি’ এ রকম একটা কথা ছড়িয়ে দেয়। তাৎক্ষণিক মব তৈরি করে সেখানে। এরপর চারদিক থেকে শুরু হয় আমাকে কিল-ঘুসি, খামচি দেওয়া। আমার পরিহিত পাঞ্জাবি টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়।’ পরে সেখানে উপস্থিত আরেক গণমাধ্যমকর্মীর সহায়তায় তিনি ঘটনাস্থল থেকে প্রাণে রক্ষা পান।

Screenshot Collage: Rumor Scanner 

ফেসবুকেই ১৩ ডিসেম্বর প্রথম প্রহরে MH Mintu নামের একটি প্রোফাইল থেকে করা ভাইরাল একটি পোস্টে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সাথে এক ব্যক্তির একাধিক ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে বলা হয়, “ওসমান হাদির উপরে গুলি করা ব্যক্তি আগে আওয়ামী লীগ পরে শিবির এলা বুঝুন”

Screenshot: Facebook

রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, উক্ত ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মাস্টারদা সূর্যসেন হলের হল সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) আজিজুল হক। তার সাথে সন্দেহভাজন আততায়ীর চেহারার কোনো মিল নেই। তাছাড়া, হাদির ওপর হামলাকারীদের খুঁজে পাওয়া সংক্রান্ত পোস্টও করতে দেখা গেছে তাকে। 

সে সময় ফেসবুকে দুইজন ভিন্ন ব্যক্তির ভিডিও ছড়ায়। দাবি করা হয়, ট্রেনে করে হাদিকে গুলি করা ব্যক্তি পালিয়ে যাচ্ছে। ভিডিওগুলোর একটিতে দেখা যায়, ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিচ্ছেন এক ব্যক্তি। তবে আখাউড়া রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ জানিয়েছেন, ভিডিওতে থাকা ব্যক্তির নাম আবুবক্কর সিদ্দিক ইমন (২৫)। তিনি একজন সাধারণ যাত্রী। ইমন প্রায় ১০ দিন আগে নিজস্ব পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ট্রেনের টিকিট কেটেছিলেন। যাত্রার সময় তার সঙ্গে ছিলেন পরিবারের সদস্যরা—পিতা, মাতা, স্ত্রী নুপুর, কন্যা সোহানা এবং দুই খালা বিলকিস ও জান্নাতুল ফেরদৌস। তদন্তে তাদের কারও বিরুদ্ধে কোনো সন্দেহজনক তথ্য পাওয়া যায়নি।

Screenshot Collage: Rumor Scanner

আরেক ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে ট্রেন থেকে নেমে আসতে দেখা যায়। তবে রিউমর স্ক্যানারের আনুষঙ্গিক বিশ্লেষণে আলোচিত ব্যক্তির চেহারা, উচ্চতা ইত্যাদির মিল পাওয়া যায়নি। 

একই দিন রাতে একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়, হাদির ওপরে হামলাকারীদের মধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমন দাবিতে প্রচার হওয়া একটি ভিডিওই ফেসবুকইউটিউবের দুইটি আলাদা আপলোড থেকে দেখা হয়েছে প্রায় ১.২ মিলিয়ন বার। 

Screenshot Comparison: Rumor Scanner

তবে রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখতে পায়, গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ফার্মগেট থেকে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আরাফাত ইসলাম খান সাগরকে আটকের ঘটনার ভিডিও এটি। 

একই দিন (১৩ ডিসেম্বর) হাদির প্রচারণার সময়ের একটি ভিডিওতে হাদির পাশের এক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে ফেসবুকের ক্যাপশনে লেখা হয়, “খু’নি কে কাছে থেকে চিনতে পারলেন না ওসমান হাদি!” ভিডিওটি এখন পর্যন্ত দেখা হয়েছে ১ মিলিয়নেরও বেশি বার। 

Screenshot: Facebook

তবে রিউমর স্ক্যানার অনুসন্ধানে জেনেছে, উক্ত ব্যক্তি হাদির প্রচারণা দলের সক্রিয় কর্মী। তার নাম আবু উসামা জাহেরী। ফেসবুকে তিনি এ বিষয়ে এক ফেসবুকে পোস্টে বলেছেন, “আমাকে নিয়ে যে প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানো হচ্ছে প্লিজ কেউ বিব্রত হবেন না!”

এভাবে ঘটনা পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত আটজন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিকে হাদির ওপর হামলাকারী হিসেবে সন্দেহ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালানোর প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার।  

এসব ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই হাদিকে গুলির ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তি, বাইক চালক এবং বাইকটির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে এসেছে৷ সাংবাদিক জাওয়াদ নির্ঝর ও অনুসন্ধানী প্লাটফর্ম দ্য ডিসেন্ট ১২ ডিসেম্বর রাত ৮ টার কিছু সময় পরে দাবি করে, হাদিকে গুলি করে যে ব্যক্তি তার নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান। সাংবাদিক ইসরাফিল ফরায়েজী সেদিন রাত ১০ টা ১৫ মিনিটে এক ফেসবুক পোস্টে কিছু ছবি যুক্ত করে জানান, সন্দেহভাজন এই ব্যক্তি গত ৯ ডিসেম্বর ওসমান হাদি পরিচালিত ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারে আসে। ১৩ ডিসেম্বর সকালে পুলিশের পক্ষ থেকেও একই ছবি প্রকাশ করে এই ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়। ইনকিলাব মঞ্চের নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা ১৩ ডিসেম্বর দুপুরে এক ফেসবুক পোস্টে একটি ছবি প্রকাশ করেন যাতে সন্দেহভাজন ফয়সালের সাথে আরো দুই ব্যক্তি ছিল। এদের ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এই ছবি প্রকাশের পর সেদিন রাত সাড়ে ১১ টায় ফেসবুকের একটি গ্রুপে এই ছবি থেকে আরেক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে বলা হয়, তার নাম আলমগীর এবং সে সুনিবিড় হাউজিংয়ে থাকত। ১৫ ডিসেম্বর মধ্যরাতে হাদিকে হত্যা চেষ্টার ঘটনায় রাজধানীর পল্টন থানায় মামলা হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। মামলায় সন্দেহভাজন ফয়সাল করিমসহ অজ্ঞাতনামাদের এই মামলার আসামি করা হয়েছে। জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর ১৫ ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে পুলিশের সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ঘটনায় জড়িত হিসেবে এ পর্যন্ত তিনজনকে শনাক্ত করা গেছে। তাদের মধ্যে মোটরসাইকেলের পেছনে বসে গুলি চালান ছাত্রলীগের নেতা ফয়সল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল, চালক ছিলেন আলমগীর শেখ। ঘটনার আগে হাদিকে অনুসরণকালে (রেকি) এই দুজনের সঙ্গে আরও একজন ছিলেন। তার নাম রুবেল। তিনি আদাবর থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মী বলে জানা গেছে। এই তিনজনকে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। 

আরও পড়ুন

spot_img