বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বাঙালি অফিসার মতিউর রহমান একটি যুদ্ধবিমান নিয়ে পালিয়ে আসার চেষ্টা করার সময় ওই বিমানে থাকা রশিদ মিনহাজ নামে পাকিস্তানী শিক্ষানবীশ পাইলটের সাথে ধস্তাধস্তিকালে বিমানটি বিধ্বস্ত হয় এবং দুজনই নিহত হন। সেদিনই মতিউরকে দাফন করা হয় পাকিস্তানের মাশরুর বিমানঘাঁটির কবরস্থানে। স্বাধীনতার পর মতিউর রহমানকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করা হয়। ২০০৬ সালের ২৪ জুন তাঁর দেহাবশেষ বাংলাদেশে এনে পরদিন মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
বহু বছর ধরেই বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে জড়িয়ে সংবাদমাধ্যমের পাতা থেকে শুরু করে সর্বমহলে একটি আলোচনা আছে যে, মতিউরকে পাকিস্তানে যে কবরস্থানে দাফন করা হয়েছিল সেখানে মতিউরের কবরের উপর লেখা ছিলো ‘ইধার শো রাহা হ্যায় এক গাদ্দার’। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, ‘এখানে শুয়ে আছে এক বেঈমান।’
জাতীয় দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের ২০০৫ সালের ২৪ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবিটি পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে লেখা রয়েছে, তাকে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের জন্য উপযুক্ত একটি কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছিল। এমনকি পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ মাশরুর বিমান ঘাঁটির প্রধান প্রবেশপথে তার ছবি টাঙিয়ে এবং তাকে গাদ্দার (বিশ্বাসঘাতক) হিসেবে চিহ্নিত করে এই বীরকে অপমান করার সাহস করেছিল।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিনই মতিউর রহমানের মরদেহ পাকিস্তানে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের তাৎক্ষণিক উদ্যোগের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে একটি সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়।
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (SEM) আয়োজিত সমাবেশে এসইএম-এর আহ্বায়ক আবু নাসের খানের বক্তব্যেও একই দাবির বিষয়টি আসে। তিনি বলেন, “পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বিমানঘাঁটির প্রধান প্রবেশপথে মতিউরকে “গদ্দার” হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে অপমান করার সাহস করেছে।”
২০২১ সালের আগস্টে দ্য ডেইলি স্টারের আরেক প্রতিবেদনে কিছুটা ভিন্ন দাবি করা হয়। বলা হয়, “মতিউর রহমানের কবরের সামনে লেখা ছিল ‘ইধার সো রাহা হ্যায় এক গাদ্দার’ বা ‘এখানে ঘুমিয়ে আছে এক বিশ্বাসঘাতক’।”

একই পত্রিকা একবার দাবি করছে, মাশরুর বিমান ঘাঁটির প্রধান প্রবেশপথে মতিউরের ছবি টাঙিয়ে এবং তাঁকে গাদ্দার (বিশ্বাসঘাতক) হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছিল। এর ১৬ বছর পরে আবার দাবি করছে, লেখাটা ছিল মতিউর রহমানের কবরের সামনে।
তখন পর্যন্ত এই দাবিগুলোর পক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ বা ছবি প্রকাশ্যে আসেনি। তবে ২০০৫ সালের ২৪ মার্চের দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনের সাথে একটি ছবিও যুক্ত ছিল। ছবিটির ক্যাপশন থেকে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে করাচির মাশরুর বিমানঘাঁটির কবরস্থানে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের কবর জিয়ারত করেন তাঁর মেয়ে মাহিম মতিউর খন্দকার, তার স্বামী এবং ছেলে। ছবিটি পর্যালোচনা করে কবরের সামনের অংশে ছোট একটি নামফলক সদৃশ উপাদান দেখা যায়। ছবিটি দূর থেকে ধারণ করার কারণে নামফলকে ঠিক কী লেখা ছিল তা বোঝা যাচ্ছে না৷ তবে এটা বোঝা যায় যে, ‘ইধার শো রাহা হ্যায় এক গাদ্দার’ এর মতো এত লম্বা বাক্য জায়গা দেওয়ার মতো অত বড়ও ছিল না নামফলকটি।

২০২১ সালের ২১ মার্চ ‘RMS Motivation’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে কবরের দুইটি ছবি দেখানোর সময়ও একই দাবি করা হয়। বলা হয়, ২০০৬ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানে মতিউর রহমানের কবরের উপর উর্দুতে লেখা ছিল, ইধার সো রাহা হ্যায় এক গাদ্দার। সাড়ে চার বছরে এই ভিডিও দেখা হয়েছে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বার।

কবরের একটি ছবি উইকিমিডিয়া কমন্সে (ফ্লিকারেও) পাওয়া গেছে। যাতে কবরটি রশিদ মিনহাজের (যার সাথে মতিউরের দস্তাদস্তি হয়েছিল) বলে লেখা রয়েছে। ছবিটি গুগল লেন্সে ট্রান্সলেট করেও একই তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তানের গণমাধ্যম সূত্রেও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে যে, কবরটি রশিদ মিনহাজেরই।
অপর ছবিটি যে মতিউরের কবরের তা কবরের গায়ের ইংরেজি লেখা থেকেই স্পষ্ট। তবে ইংরেজি লেখাগুলোর উপরে আরবিতে ক্যালিগ্রাফি আকারে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ লেখা রয়েছে।

অর্থাৎ, এই দুই ছবির কোনোটিতেই বেঈমান বা সমজাতীয় কোনো শব্দ উল্লেখ নেই।
পাকিস্তানে ২০০৬ সালে মতিউরের দেহাবশেষ কবর থেকে তোলার আগে ধারণ করা সে স্থানের কিছু ছবি খুঁজে পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার।

ছবিগুলোতে দেখা যাওয়া মতিউরের কবরের নামফলকের সাথে ১৯৯৪ সালে তাঁর মেয়ের পরিদর্শনের সময়ের ছবিতে থাকা কবরের নামফলকের ডিজাইনের অবশ্য মিল নেই। তবে বাকি ডিজাইনে মিল পাওয়া যায়। নামফলকটি পরবর্তী সময়ে (১৯৯৪ সালের পর) বদলানো থাকতে পারে বলে প্রতীয়মান হয়৷ কবরের উপরিভাগে যে সাদা রং রয়েছে তা সে সময়ই আনুষ্ঠানিকতা সারতে লাগানো হতে পারে।
বহুল আলোচিত এই দাবিটি নিয়ে পরবর্তীতে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ইমরান সাঈদ নামে পাকিস্তানের এক লেখকের সন্ধান পায় রিউমর স্ক্যানার। ইমরান সাঈদ বর্তমানে কানাডায় থাকেন। পছন্দ করেন ইতিহাস, লোকগাথা এবং সামরিক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করতে। তার এক্স অ্যাকাউন্টে কিছু পোস্ট নজরে আসে রিউমর স্ক্যানারের। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এসব পোস্টে মতিউর রহমানের বিষয়ে বেশকিছু তথ্য পাওয়া যায়। এই পোস্টগুলো তার একটি ব্লগসাইটেও তিনি প্রকাশ করেন ২০১৯ সালের আগস্টে। এই ব্লগের ঘটনাবলি ২০১৮ সালের, যখন তিনি পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। সে সময় তিনি মাশরুর বিমানঘাঁটিতে যান। ঘাঁটিটি পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সর্ববৃহৎ ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, যার অবস্থান করাচির মৌরিপুরে। ইমরান তার লেখায় মাশরুর বিমানঘাঁটির কিছু ছবি দিয়েছেন। একটি ছবিতে গুগল আর্থ থেকে একটি অংশ চিহ্নিত করে এটিকে বেসামরিক কর্মচারীদের কবরস্থান বলা হয়েছে। অর্থাৎ, এটিই সেই স্থান যেখানে মতিউর রহমানকে কবর দেওয়া হয়েছিল।

ইমরান এই কবরস্থান এবং মতিউর রহমান যেখানে শহীদ হয়েছিলেন সেখানে গিয়েছিলেন তার এই সফরে, ঘুরে দেখেছেন আশেপাশের এলাকাগুলো।
রিউমর স্ক্যানার ইমরান সাঈদের সাথে যোগাযোগ করেছে। তিনি জানান যে আলোচিত দাবিটির বিষয়ে তিনি কখনো শোনেননি এবং এ সংক্রান্ত কোনো ছবিও তিনি দেখেননি। ইমরানের কাছ থেকেও ১৯৯৪ সালে মতিউরের মেয়ের কবর পরিদর্শনের ছবিটির বিষয়ে জানা যায়। তিনি বলছিলেন, “আমি যেসব ছবি দেখেছি, তার মধ্যে সবচেয়ে পুরনোটি নব্বইয়ের দশকের, যখন মতিউর রহমানের মেয়ে তাঁর স্বামীসহ বাবার কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলেন। সেই ছবিতে কোনো কবরের ফলক ছিল না, বরং একটি ছোট ধাতব প্লেট দেখা যায়। সম্ভবত প্লট নম্বর চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত।”
২০০৬ সালে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া প্রতিনিধি দলের কাছে মতিউরের মরদেহ হস্তান্তরের জন্য কবর খননের সময় কবরের উপর যে ফলক দেখা যায়, তা ওই আনুষ্ঠানিকতার জন্য পাকিস্তান বিমানবাহিনী নতুনভাবে স্থাপন করেছিল বলে জানান ইমরান।
কবরস্থানে প্রবেশদ্বারে দাবিকৃত কোনো শব্দচয়নের ব্যবহার কখনও ছিল কিনা সে প্রশ্নও ছিল ইমরানের কাছে। তিনি জানান, ‘পাকিস্তান বিমান বাহিনী বেস মাশরুরের কবরস্থানের চারপাশে কোনো প্রাচীর ছিল না, এখনও নেই। এই কবরস্থানে প্রবেশের জন্য কখনোই কোনো ফটক ছিল না, না পুরো কবরস্থানের জন্য, না ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের কবরে যাওয়ার জন্য।”
১৯৭৫ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন কায়সার তুফাইল। তিনি ২০১২ সালে নিজের একটি ব্লগসাইটের লেখায় মতিউরের ঘটনাটির বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তবে এই লেখায় কবরের বিষয়টির উল্লেখ ছিল না।
কায়সার তুফাইলের সাথে পরবর্তীতে আলাপকালে তিনি রিউমর স্ক্যানারকে জানান, “আমি ২০০৩ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত মাশরুর বিমানঘাঁটির বেস কমান্ডার ছিলাম এবং আমি কখনো এমন কোনো মন্তব্য (যেমন “এখানে ঘৃণিত একজন গাদ্দার ঘুমিয়ে আছে”) শুনিনি।”
কায়সার তুফাইল জানান, এর আগে তিনি ১৯৮২-৮৫ এবং ১৯৯২-৯৪ সালে দুই দফায় মাশরুর বিমানঘাঁটিতে কর্মরত ছিলেন। সে সময়গুলোতেও তিনি এমন কোনো অপমানজনক মন্তব্য কবর বা কবরস্থানের গেটে লেখা আছে বলে শোনেননি।
কায়সার বলছিলেন, “মতিউর রহমানের কবরটি নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত ছিল না, কেবল একটি নম্বর দেওয়া ছিল, তাই কেউ জানত না এটি কার কবর।”
এ বিষয়ে জানতে কয়েক দফায় মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমানের সাথে যোগাযোগ করলেও তিনি এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাছাড়া, পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতরেও (আইএসপিআর) এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করে সাড়া পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের মরদেহ পাকিস্তানে সমাহিত থাকাকালীন সময়ে তার কবরের ওপর বা প্রবেশপথে বেঈমান বা সমজাতীয় শব্দ/বাক্য লেখা থাকার বহু বছর ধরে প্রচালিত যে দাবি, সমস্ত তথ্য-ছবি বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে সে দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।





