বুধবার, ডিসেম্বর 17, 2025

ইন্টারনেটে ক্রমাগত অপতথ্যের শিকার এনসিপি নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতু

ঘটনার শুরু ২৮ নভেম্বর। সকাল ১০ টার কিছু পরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা মিতু নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে করা এক পোস্টে নিজের একটি পোস্টের কমেন্টের স্ক্রিনশট শেয়ার করে জানান, “অনেক দিন ধরে আমি বার বার কতিপয় ছাত্রদলের ছেলেদের বাজে কথা ,নোংরা কথা সহ্য করছি।ক্যান ভাই তোদের সাথে গিয়ে আমি গালাগালি করি? দল হিসেবে বি এন পির সমালোচনা করলে তোরা এন সিপির সমালোচনা কর। নোংরা কথা কেন বলবি?” 

মিতু লিখেছেন, কমেন্টকারী তার প্রতিটি পোস্টে বাজে কমেন্ট করেন। “মানুষের সহ্যের একটা সীমা থাকে সেই সীমা কতিপয় ছেলেরা একদম অতিক্রম করছে। অন্যের মেয়েরে গালি দিলে খুব মজা লাগে আর নিজের গায় পড়লে তখন ভদ্রতা শিখাতে আসে।”

“ছাত্রদলের পোষ্টেড আমার মাঝখানে সিল মারতে কেন আসবে? আর আমি কি অন্যায় করেছি যে আমাকে এই ধরনের কমেন্ট করবে। এটা একবার না। এদের কতিপয়কে কিচ্ছু দিয়ে বোঝানো যায় না। আইসাই কু** কুরের মতো ঘেউঘেউ করে।”

Screenshot: Facebook

এই পোস্ট পরবর্তী সময়ে দুপুর ১২ টার কিছু পরে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আসিফ সৈকত পাল্টা এক ফেসবুক পোস্টে মিতুকে উদ্দেশ্য করে লিখেন, “ তারেক রহমান ৫ই অগাস্টের পর দ্রুত সময়ের মধ্যে  নির্বাচন চেয়েছিলেন। বিনিময়ে তাকে ” চ্যাডের পোলা ” ডেকেছিলো ডা:মাহমুদা মিতু।  ( স্ক্রীণশট ১)  

আমি প্রতিবাদ করলে সে পাল্টা স্ট্যাটাস দিয়ে দম্ভ ভরে স্বীকার করেছিলো – বিপ্লবী আইডি টি তারই , এবং তারেক রহমান নির্বাচন চাওয়ার জন্য রেগে সে ঐ জঘন্য মন্তব্য করেছিলো এবং মন্তব্যের জন্য সে বিন্দুমাত্র অনুতপ্ত নয়। (স্ক্রীণশট ২) 

এনসিপি আজ এসব নোংরামো অস্বীকার করে বিএনপির কাছেই আসন চাইলে হবে ? 

এনসিপির সাথে বিএনপি জোটের পক্ষে আমি নই।” 

আসিফ সৈকত যে স্ক্রিনশটগুলো প্রচার করেছেন তা সাম্প্রতিক সময়ের নয়। তিনি গত ২৪ জানুয়ারিও এই স্ক্রিনশটগুলো যুক্ত করে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন। প্রথম স্ক্রিনশটটি জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাকের একটি ফটোকার্ড যুক্ত পোস্টের। গত বছরের ০৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পর তারেক রহমানের এক ভিডিও বার্তায় করা “জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবকে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে যথাসম্ভব দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি অবাধ,সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে অবশ্যই ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।” শীর্ষক মন্তব্যকে কোট করে ইত্তেফাক এই ফটোকার্ডটি প্রচার করে। এই ফটোকার্ডের পোস্টে ডা. মাহমুদা মিতু নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে কমেন্ট করে বলা হয়, “তুমি আয়োজন করার কেডা? চ্যাডের পোলা।” 

Screenshot: Facebook

এই অ্যাকাউন্টটি বর্তমানে সচল পাওয়া যায়নি। রিউমর স্ক্যানারকে ডা. মাহমুদা মিতু জানিয়েছেন, এই অ্যাকাউন্টটি তার ছিল না এবং এই কমেন্টটিও তার করা নয়৷ একই অ্যাকাউন্ট থেকে গত সেপ্টেম্বরে প্রচার করা ভাইরাল একটি ভিডিওর বিষয়েও ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করে রিউমর স্ক্যানার। 

আসিফ সৈকতের আরেকটি স্ক্রিনশটে দেখা যায়, মাহমুদা মিতু নামের অ্যাকাউন্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে করা পোস্টে এই কমেন্ট করার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। 

Screenshot: Facebook 

যদিও এই পোস্টটিও এখন ফেসবুকে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এই পোস্ট করা অ্যাকাউন্টে যে প্রোফাইল ছবি দেখা যাচ্ছে, সেটিই সে সময় দেওয়া ছিল মাহমুদা মিতুর বর্তমান অ্যাকাউন্টে। মিতু রিউমর স্ক্যানারকে জানিয়েছেন, তিনি কমেন্টের স্ক্রিনশটটি দেখে তার অ্যাকাউন্টের কমেন্ট ধরে নিয়ে তাৎক্ষণিক বিভ্রান্ত হয়ে পোস্টটি করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে তা সরিয়ে নেন। 

২৮ নভেম্বর মিতু-আসিফের মধ্যকার এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই Kutub Uddin নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইলে দিনভর ডা. মাহমুদা মিতুকে জড়িয়ে পাঁচটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়৷ এর মধ্যে তিনটি ফটোকার্ড কালের কণ্ঠ এবং দুইটি ফটোকার্ড প্রথম আলো’র আদলে তৈরি করে প্রচার করা হয়েছে। পোস্টগুলো দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে। যদিও এই দুই পত্রিকা এসব ফটোকার্ড প্রচার করেনি বলে নিশ্চিত হয়েছে রিউমর স্ক্যানার।  

Screenshot Collage: Rumor Scanner 

ফটোকার্ডগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ‘বয়ফ্রেন্ডের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় আটক মেডিকেল শিক্ষার্থী, এলাকাবাসীর গণধোলাই।’ শিরোনামের ফটোকার্ডটিতে মিতুর যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে তা নেওয়া হয়েছে তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে। ছবিটি তিনি ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ করেন। তবে ‘এনসিপি নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতুর বিকিনি পরা ছবি ভাইরাল, খোজ নিয়ে যা জানা গেল।’ শিরোনামের ফটোকার্ডটিতে মিতুর যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে তা বাস্তব ছবি নয়। এআই এর মাধ্যমে ছবিটি তৈরি করা হয়েছে। মিতু নিজেও বিষয়টি রিউমর স্ক্যানারকে নিশ্চিত করেছেন। 

এছাড়া দুইটি ফটোকার্ডে মিতুর চুমুর দৃশ্য দাবিতে আপত্তিকর দুইটি ছবি বসানো হয়েছে। একটি ছবিতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদকে দেখা যাচ্ছে। অন্যটিতে পুরুষ ব্যক্তিটির চেহারা স্পষ্ট না হলেও মিতুর ছবিটি নেওয়া হয়েছে তার ফেসবুকের পোস্ট থেকে। দুইটি ছবিই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আপত্তিকর এসব ছবি ফেসবুকের অন্যান্য পোস্টে-কমেন্টেও ছড়িয়েছে। 

কুতুব উদ্দীন নামের অ্যাকাউন্টটির পরিচিতি অংশে এনসিপির যুক্তরাজ্য শাখার সদস্য সচিব হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। তবে যাচাই করে এই নামে উক্ত শাখায় কোনো ব্যক্তি পাওয়া যায়নি। একই পরিচিতি অংশ নিজেকে ছাত্রশিবিরের সাথী বলেও পরিচয় দেওয়া হয়েছে। দুই দলের পরিচয় যুক্ত রেখে নিজের মূল পরিচয় লুকানোর চেষ্টা বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এই অ্যাকাউন্ট ভুয়া ফটোকার্ড বানানোর জন্য বেশ পরিচিত। 

এছাড়া, সময় টিভির আদলে আরেকটি ফটোকার্ডও ছড়িয়েছে ফেসবুকে, যেখানে মিতুর ছবি যুক্ত করে দাবি করা হচ্ছে, “২৮ নভেম্বর রাতে দৌলতদিয়া পতিতা পল্লি থেকে ডা. মাহমুদা মিতু  নামে এক নারী নিখোঁজ।”

যাচাই করে দেখা গেছে, সময় টিভি এমন কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশ করেনি।

এদিকে মিতুকে জড়িয়ে এমন অপপ্রচারের মধ্যে একটি ভিডিও প্রচার হয়েছে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকে। ‘দৃষ্টিকোণ’ নামের একটি প্লাটফর্ম থেকে প্রচারিত ভিডিওতে এক নারী মিতুকে জিজ্ঞেস করেন, “আপনার বিরুদ্ধে যে বিএনপির লোকজন রিউমার ছড়াচ্ছে, আপনি কীভাবে দেখছেন?” জবাবে মিতুকে বলতে শোনা যায়, “বিএনপি যে একটা পঁচা দল তা দেশের জনগণ দেখতে পাচ্ছে, এটার ফল তারা নির্বাচনে পাবে।”

 Screenshot: TikTok

রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, মিতু প্রকাশ্যে এমন মন্তব্য করেননি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল ‘ডিপফেক-ও-মিটার’ এর ‘AVSRDD (2025)’ মডেলের মাধ্যমে ভিডিওটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ। ‘দৃষ্টিকোণ’ নামের এই প্লাটফর্মটি নিয়মিতই এই ধরণের এআই কনটেন্ট প্রচার করে থাকে।

সবমিলিয়ে, ২৮ নভেম্বর এনসিপি নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতুকে জড়িয়ে অন্তত তিনটি গণমাধ্যমের ছয়টি ভুয়া ফটোকার্ড এবং এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। 

মাহমুদা মিতু ২৮ নভেম্বর এক ফেসবুক লাইভে দাবি করেন, “আসিফ সৈকত নামে একটা লোক কিছু স্ক্রিনশট ছাড়ে কিছুদিন পর পর, তার সাথে প্রথম ঝামেলাটা হয়েছে ও প্রথমে আমার দলের সর্বোচ্চ নেতার ফ্যামিলি নিয়ে একটা কথা বলছিল। আমি এটা প্রটেস্ট করার পরে এই আসিফ সৈকত তারেক জিয়ার নামে আমার ফেক স্ক্রিনশট নিয়ে শুরু করছে। সবাই জানে যে ও টোটালি একটা গুজববাজ, পুরোপুরি গুজব ছড়ায়। যা লেখে সবসময় মিথ্যা লেখে। সে পুরা একটা কমিউনিটিকে আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। ও এই কাজটা করে এবং কমেন্টস অফ করে রাখে। এই লোকটার নামও আমি মুখে নিতে চাই না। কারণ ওর নাম মুখে নেওয়া মানে হচ্ছে ওকে একটু পর্যায়ে নিয়ে আসা।”

“ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা শুরু থেকেই তাকে হেনস্তা করে আসছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, আসিফ সৈকত অনলাইনে অনেক বেশি বাড়াবাড়ি করছে। অনেক বেশি। আজকে পুরা যে ঘটনাগুলো ঘটছে, এটার পুরা দায় আমি আসিফ সৈকতকে দেব। শুধু আজকে না, গত কয়েক মাসে আমাকে নিয়ে যা হয়েছে, আমি যতটা না বিএনপির-ছাত্রদলের ছেলেদেরকে দায়ী করব, তার চেয়েও অনেক বেশি দায়ী করব আসিফ সৈকতকে।”

মিতু দাবি করেন, “আসিফ সৈকত নাহিদ ইসলামের (এনসিপি আহ্বায়ক) পরিবারকে নিয়ে অনেক আজেবাজে কথা বলেছিল। সেটার আমি প্রতিবাদ করছি। সেই থেকেই ছেলেটা আমার পিছনে লাগছে এবং কন্টিনিউয়াসলি সে আমার নামে ফেক পোস্ট দিয়ে যাচ্ছে। কখনো রেড ক্রিসেন্টের দুর্নীতি, কখনো তারেক রহমানের নামে আজেবাজে কথা। আমার বিরুদ্ধে কিছু একটা শুনলেই আসিফ সৈকত ধুম করে লাফ দিয়ে ওঠে। এই ছেলেটা সরকারি চাকরি করে। সরকারি চাকরি করা অবস্থায় এইভাবে কেউ কাউকে হ্যারাস করতে পারে কিনা আমি জানিনা।” 

রিউমর স্ক্যানারের সাথে আলাপেও মিতু একই তথ্য জানান। মিতু বলছেন, তার সন্তানকে নিয়েও বাজে মন্তব্য করা হচ্ছে এ সংক্রান্ত পোস্টের কমেন্টগুলোয়। তিনি এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবছেন বলে জানান। 

আরও পড়ুন

spot_img