খবরটা আসে আজ (৩০ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ছয়টার পরে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে তাকে জানিয়েছেন, ‘আম্মা আর নেই।’ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এ যাত্রায় আর ফিরলেন না। দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক নানা জটিলতায় চিকিৎসাধীন থেকে ৮০ বছর বয়সে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
গেল কয়েক বছর ধরেই বার বারই খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে গুজব আর গুঞ্জন ছিল সর্বত্র। রিউমর স্ক্যানার খালেদা জিয়ার অসুস্থতা সংক্রান্ত প্রথম গুজব শনাক্ত করে ২০২১ সালে। সে বছরের ১১ এপ্রিল খালেদা জিয়ার করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর ২৭ এপ্রিল তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়৷ এরপরই নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে থাকে তাকে নিয়ে। এর মধ্যে একটি দাবি ছিল এমন যে, তীব্র শ্বাসকষ্টের কারণে খালেদা জিয়াকে আইসিইউতে নেয়া হয়েছে। তবে যাচাই করে দেখা যায়, আইসিইউতে নয়, তাকে নেওয়া হয়েছিল সিসিইউতে। এরপর থেকে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে নানা অপতথ্যের প্রচার ছিল৷
সে বছরের নভেম্বরে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা এক নারীর ছবি বেশ ভাইরাল হয়, যাকে খালেদা জিয়া বলে দাবি করা হচ্ছিল। রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখে, জালাল উদ্দীন ওয়াসিম নামে এক ব্যক্তির মায়ের ছবি এটি, যিনি সে বছরের ফেব্রুয়ারিতে মারা যান৷

এই ফ্যাক্টচেকের পরও পরের বছরগুলোতে বিভিন্ন সময়ে এই নারীকে খালেদা জিয়া দাবি করে প্রচার চলেছে।
পরের বছরগুলোতে বিভিন্ন সময়ে খালেদা জিয়াকে অসুস্থতাজনিত কারণে হাসাপাতালে যেতে হয়েছে। সঙ্গী ছিল গুজব আর অপতথ্যের প্রচারও। গত বছরের (২০২৪) ২১ জুন শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে খালেদা জিয়াকে এভারকেয়ারে ভর্তি করা হয়। পরদিনই তার হৃদ্যন্ত্রে পেসমেকার বসানো হয়। ০২ জুলাই তিনি বাসায় ফেরেন। এর মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে তার মৃত্যুর গুজব।

ভুয়া থাম্বনেইল আর মনগড়া তথ্য দিয়ে এই দাবিটি প্রচার করা হয়েছিল সে সময়।
২০২৪ সালে আরো দুই দফায় খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দাবিটি ছড়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। জুলাইতে ছাত্র-জনতা যখন রাস্তায় নেমে এসে আন্দোলনে উত্তাল করে তুলেছিল রাজপথ, সে সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কিছু পোস্টে দাবি করা হচ্ছিল, খালেদা জিয়া মারা গেছেন।

তৎকালীন সরকারের নির্দেশে ইন্টারনেট বন্ধ থাকার মধ্যে সেসময় এই দাবিটি মানুষের মুখে মুখেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় খালেদা জিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় এই গুজব বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে অনেকের কাছে। পরবর্তীতে বিষয়টি গুজব বলে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়। সেপ্টেম্বরে ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার কিছু পুরোনো ভিডিও একসাথে যুক্ত করে খালেদা জিয়া মারা গেছেন দাবিতে ফের ভুয়া ভিডিও প্রচার করা হয় ইউটিউবে।
চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে ৬ মে তিনি দেশ ফেরেন। তার লন্ডন থাকাকালীন সময়ে অন্তত দুইবার তার মৃত্যুর গুজব ছড়িয়েছে। জানুয়ারিতে তিনি লন্ডনে যাওয়ার পরপরই ইউটিউবে প্রচারিত একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়, খালেদা জিয়া লন্ডনে মারা গেছেন। দুই দিনের ব্যবধানে ভিডিওটি ছয় লক্ষাধিক বার দেখা হয় সে সময়। ভাইরাল ভিডিওটি পরবর্তীতে ছড়িয়ে যায় অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও। যাচাই করে দেখা যায়, পুরোনো পন্থায় বিভিন্ন ভিডিও ভিডিওর ফুটেজ জোড়া দিয়ে মনগড়া তথ্যের মিশেলে ভুয়া ভিডিও বানিয়ে প্রচার করা হচ্ছিল।

পরের মাসেই জালাল উদ্দীন ওয়াসিমের প্রয়াত মায়ের পুরোনো ছবিটি ব্যবহার করেই ফের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর গুজব ছড়ায় টিকটকে।।
লন্ডন থেকে খালেদা জিয়া দেশে ফেরার পরও গুজবের এই প্রবাহ থেমে যায়নি। ২৬ মে ব্লগস্পটের ফ্রি ডোমেইনের ওয়েবসাইট ব্যবহার করে দাবি করা হয়, সেদিন সন্ধ্যায় রাজধানীর গুলশানের নিজ বাসভবন ‘ফিরোজা’তে ইন্তেকাল করেছেন খালেদা জিয়া। দাবিটি ছিল সম্পূর্ণ ভুয়া। ফ্রি ডোমেইনের ব্লগসাইট ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ানোর এই পদ্ধতি গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই ব্যবহার হয়ে আসছে। চলতি বছরের এপ্রিলে রিউমর স্ক্যানারের ইনভেস্টিগেশন ইউনিট এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে বেরিয়ে এসেছে এসব সাইটের পেছনে কারা আছেন, কারাই বা এসব সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন এবং কাদের এসব অপতথ্যের শিকার বানানো হচ্ছে।
খালেদা জিয়াকে সর্বশেষ গত ২৩ নভেম্বর রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিডনি, হৃদরােগ, নিউমোনিয়াসহ শারীরিক নানা জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকা বর্ষীয়ান এই নেত্রীর অসুস্থতা নিয়ে সে সময় থেকেই উৎকণ্ঠা ছিল জনমনে। একই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল নানা গুজবের প্রচারও। তিনি হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই কখনো বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে উদ্ধৃত করে, কখনো তার পুত্রবধূ ডা. জোবাইদা রহমানের বরাত দিয়ে প্রচার হয়েছে তার মৃত্যুর গুজব। গুজবের এই প্রসার কতটা তীব্র হয়ে উঠেছিল তা বোঝা যায়, এই দাবিটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার নানা উপায়ের ব্যবহার দেখে। ২৯ নভেম্বর মির্জা ফখরুলের নামে ভুয়া শোক বার্তা ছড়িয়ে, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদ শুনে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে তারেক রহমানের রওয়ানা হওয়ার দাবিতে পুরোনো ভিডিওর ব্যবহার এবং খালেদা জিয়ার মৃতদেহ দেখতে হাসপাতালে গিয়েছেন তিন বাহিনীর প্রধান দাবি করে গণমাধ্যমের ভুয়া ফটোকার্ড বানিয়ে প্রচার করা হচ্ছিল।

এমন দাবিও ছড়িয়েছে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণমাধ্যমগুলোতে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদ প্রচার করতে দিচ্ছে না।
এসব কনটেন্ট বহু মানুষের কাছে যে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছিল তা কনটেন্টগুলোর এনগেজমেন্ট দেখেও কিছুটা ধারণা করা যায়। সে সময় টিকটকে যমুনা টেলিভিশন নামের একটি অ্যাকাউন্টে অন্তত চারবার ভিন্ন ভিন্ন ভিডিওর মাধ্যমে প্রচার হয়েছে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দাবি। ভিডিওগুলো সম্মিলিতভাবে দেখা হয় প্রায় ১৭ মিলিয়নের বেশি বার।

এক মাসের বেশি সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর আজ (৩০ ডিসেম্বর) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন খালেদা জিয়া। এই সময়ের মধ্যে তার অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে অন্তত ৩৪টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। সবমিলিয়ে চলতি বছর খালেদা জিয়াকে জড়িয়ে অন্তত ৪৮টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।





