- ভারত থেকে পরিচালিত ‘All Time Happy’ পেজ থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে অপপ্রচার
- পেজটি থেকে প্রচারিত বাংলাদেশকে নিয়ে ১৭টি এআই-তৈরি ভুয়া ভিডিও শনাক্ত
- এআই ভিডিওর মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা
- ভুয়া ভিডিওর ভিত্তিতে ভারতীয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের ‘রিয়েকশন’ ভিডিও: অপতথ্যের দ্রুত বিস্তার
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালের শেষপ্রান্তে নিজেকে বাংলাদেশি পরিচয় দেওয়া এক তরুণীর একটি ভিডিও রিউমর স্ক্যানার টিমের নজরে আসে। ভিডিওতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ওই তরুণীকে ভারতীয়দের উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যায়, “ইন্ডিয়ান দাদারা, আমি বাংলাদেশ থেকে বলছি। একটা ছেলে আমাকে বলছে তুমি আমাকে বিয়ে করে নাও। আমি তোমাকে সব দেব, নিরাপদ রাখবো। কিন্তু দাদা, আমি খুব ভয় পাচ্ছি।”
তবে অনুসন্ধানে উঠে আসে, এটি বাংলাদেশের কোনো তরুণীর আসল আর্তনাদের ভিডিও নয়। বরং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি একটি কাল্পনিক ভিডিও। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ‘All Time Happy’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে গত ২৪ ডিসেম্বর ভিডিওটি ছড়ানো হয়।
এটি কোনো বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। গত ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় দিপু চন্দ্র দাস নামের এক হিন্দু পোশাক শ্রমিককে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার পর বিষয়টি ঘিরে দেশ-বিদেশে আলোচনা শুরু হয়। এরপর থেকেই ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সংক্রান্ত নানা প্রচারণা লক্ষ্য করা যায়। এরই ধারাবাহিকতায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে।
এর আগে, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে সৃষ্ট অস্থিরতার মধ্যে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর ও ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতীয়দের মধ্যে অপতথ্যের প্রবাহ শুরু হয়। যদিও সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালে এই প্রবণতা কিছুটা কমে এসেছিল। তবে, দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের পর তা আবারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, আলোচিত ভিডিওটি ছড়ানো ‘All Time Happy’ ফেসবুক পেজটি এমন পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। পেজটির তথ্য অনুযায়ী, এটি ২০১৯ সালের ৮ ডিসেম্বর তৈরি করা হয়। প্রায় ছয় বছর আগে খোলা হলেও এবং ৪২ হাজারের ওপরে ফলোয়ার থাকা সত্ত্বেও এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত পেজটিতে পোস্ট রয়েছে মাত্র ৯০টি। ফেসবুকের ট্রান্সপারেন্সি সেকশনের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে দুইটি অ্যাকাউন্ট দ্বারা পেজটি পরিচালিত হচ্ছে।

আলোচিত ফেসবুক পেজটিতে প্রকাশিত পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ডের পর থেকে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে পেজটি থেকে অন্তত ১৭টি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। এসব ভিডিওতে হিন্দু হওয়ায় বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীনতায় থাকা, হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ায় প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা না বলা, হিন্দু মেয়েদের বিয়ের জন্য জোর করা, দিপু চন্দ্র দাসের স্বজনদের বক্তব্যসহ (১, ২) নানা দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এ সময়ে পেজটি থেকে শুধু দিপু চন্দ্র দাসকে কেন্দ্র করেই অন্তত ছয়টি (১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬) ভিডিও প্রচার করা হয়েছে, যেগুলো সবই এআই ব্যবহার করে তৈরি বলে রিউমর স্ক্যানারের যাচাইয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এমনকি দিপু চন্দ্র দাসের বক্তব্য দাবিতে একটি ভিডিও প্রচার হতে দেখা যায়। উক্ত ভিডিওটি তিন লাখেরও বেশি বার দেখা হয়েছে। পাশাপাশি পোস্টটিতে প্রায় ছয় হাজার প্রতিক্রিয়া, ১১৯টি মন্তব্য এবং অন্তত সাড়ে চারশো শেয়ার হয়েছে। তবে রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া যায়, এই ভিডিওটিও এআই ব্যবহার করে তৈরি।

পেজটি আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পূর্বে উল্লিখিত দাবিগুলো ছাড়াও ভারত থেকে বাংলাদেশে এসে অনুশোচনা প্রকাশ অথবা হিন্দু হওয়ার কারণে মুসলিম দোকানদারের দোকানে প্রবেশে বাধা দেওয়ার মতো অভিযোগসহ প্রতিটি ভিডিওতেই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। তবে, রিউমর স্ক্যানারের যাচাইয়ে দেখা যায়, এসব দাবির প্রতিটি ভিডিওই এআই ব্যবহার করে তৈরি।

গত ১৮ ডিসেম্বরের পর থেকে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে পেজটি থেকে প্রচারিত মোট ১৭টি ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ভিডিওগুলোর সবই এআই ব্যবহার করে তৈরি। এসব ভিডিও সম্মিলিতভাবে প্রায় ২৯ লাখ বার দেখা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পোস্টগুলোতে প্রায় দুই লাখ প্রতিক্রিয়া, সাড়ে বত্রিশ হাজারেরও বেশি শেয়ার এবং পাঁচ হাজারের বেশি মন্তব্য পাওয়া গেছে। এসব মন্তব্যের অধিকাংশেই বাংলাদেশকে ঘিরে নেতিবাচক মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে।

এছাড়া, পেজটি থেকে প্রচারিত ভিডিওগুলো কেবল ওই পেজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেগুলো ইন্টারনেটজুড়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভারতীয় বিভিন্ন কনটেন্ট ক্রিয়েটরেরা এসব ভিডিও ব্যবহার করে রিয়েকশন ভিডিও তৈরি করছেন। এসব রিয়েকশন ভিডিওতে এআই-নির্মিত কনটেন্টকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করে বাংলাদেশে হিন্দু নিপীড়নের প্রমাণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ, পেজটি থেকে প্রচারিত হিন্দু মেয়েদের বিয়ের জন্য জোর করার দাবি সংক্রান্ত একটি ভিডিও ব্যবহার করে ‘Dhong Entertainment’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে একটি রিয়েকশন ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ওই ভিডিওতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওটিকে বাংলাদেশে হিন্দু নিপীড়নের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশ, ভিডিওটি বেশি বেশি শেয়ার করে আলোচিত নারীর ভারতে নিরাপদে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান এবং প্রতিবাদের ডাক দেন। রিয়েকশন ভিডিওটি প্রায় ১০ লাখ বার দেখা হয়েছে। এতে ৫৮ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া, ১ হাজার ৩০০-এরও বেশি মন্তব্য এবং প্রায় ১১ হাজার শেয়ার পাওয়া গেছে।
একইভাবে, ‘All Time Happy’ পেজ থেকে প্রচারিত আরেকটি এআই ভিডিওকে ভিত্তি করে ‘Saheb Mondal’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকেও একটি রিয়েকশন ভিডিও তৈরি করে প্রচার করা হয়েছে। ওই ভিডিওতেও এআই-নির্মিত কনটেন্টকে বাংলাদেশে হিন্দু নিপীড়নের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে হিন্দু নিপীড়নের অভিযোগ তুলে সব হিন্দুকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এই রিয়েকশন ভিডিওটি প্রায় ৭ লাখ বার দেখা হয়েছে; এতে ৩৫ হাজারেরও বেশি প্রতিক্রিয়া, ২ হাজার ৪০০-এর বেশি মন্তব্য এবং প্রায় ৬ হাজার ৮০০ শেয়ার পাওয়া গেছে।
পরিশেষে, ‘All Time Happy’ ফেসবুক পেজটির সামগ্রিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৯ সালে পেজটি খোলা হলেও নিয়মিতভাবে ভিডিও প্রকাশ শুরু হয় ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর থেকে। পেজটিতে প্রকাশিত মোট ৯০টি পোস্টের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের দুর্ঘটনা (১, ২), আর্থিক সহায়তার আবেদন (১, ২, ৩) এবং পাকিস্তানে হিন্দুদের নিরাপত্তাহীনতার দাবিতে একাধিক ভিডিও রয়েছে। রিউমর স্ক্যানারের যাচাই অনুযায়ী, এসব ভিডিওর প্রতিটিই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি।





