ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী যে কোনো সন্দেহজনক তথ্য যাচাইয়ের কাজটি নিয়মিত করেন। নিয়মিত ফ্যাক্টচেক করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেবল চার শতাংশ বিভিন্ন ফ্যাক্টচেকিং টুলস ব্যবহার করেন। বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের সাম্প্রতিক এক জরিপের ফলাফলে এই তথ্য জানা গেছে। জরিপে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, ফ্যাক্টচেক করতে তারা কী ধরণের তথ্যসূত্রের ওপর নির্ভর করে থাকেন। উত্তরে ৭৪ শতাংশ শিক্ষার্থীই ইন্টারনেটে সার্চ করার ওপর নির্ভরশীলতার কথা জানান। মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের প্রতি আস্থা কতটা এমন প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের ৫২ শতাংশই কিছুটা আস্থা আছে বলে জানিয়েছেন। সম্পূর্ণ আস্থা আছে বলে জানিয়েছেন মাত্র তিন শতাংশ শিক্ষার্থী। ফ্যাক্টচেকিং সংস্থার ওপর আস্থা নিয়ে রেটিং করতে বলায় সর্বোচ্চ ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই ৫ এর মধ্যে ৩ রেটিং দিয়েছেন।
দেশের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফ্যাক্টচেকিং সম্পর্কিত ধারণা, দক্ষতা, অপতথ্য সংক্রান্ত তাদের অভিজ্ঞতা কেমন তা জানতে গত ০৫ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর ‘ঢাবি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফ্যাক্ট-চেকিং সচেতনতা’ শিরোনামের এই জরিপ পরিচালনা করে রিউমর স্ক্যানার। জরিপে অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ১০১ জন শিক্ষার্থী।

রিউমর স্ক্যানার পরিচালিত এই জরিপে অংশগ্রহণকারী ১০১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫৮ শতাংশই পুরুষ এবং ৪২ শতাংশ নারী। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল সর্বোচ্চ (৪০ শতাংশ)। এছাড়া, এই তালিকায় আছে কলা অনুষদ (৩৪ শতাংশ), বিজ্ঞান অনুষদ (১৬ শতাংশ) এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ (১০ শতাংশ)।
জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা, প্রায় ২৮ শতাংশ। এছাড়া, চতুর্থ বর্ষের প্রায় ২৬ শতাংশ, দ্বিতীয় বর্ষের প্রায় ২৫ শতাংশ, মাস্টার্সের প্রায় ১২ শতাংশ এবং প্রথম বর্ষের প্রায় ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী জরিপে অংশ নেন।
তথ্য যাচাইয়ের অভ্যস্ততায় নিরাশা
জরিপে দেখা যায়, ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই দৈনিক গড়ে তিন ঘন্টার বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যয় করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার ভুল তথ্য দেখার হারে পরিবর্তন আনে কিনা তা বুঝতে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করা হয়, জরিপে অংশ নেওয়ার পূর্বের ৩০ দিনে সামাজিক মাধ্যমে গড়ে কী পরিমাণ ভুল তথ্য তারা দেখেছেন। দেখা যায়, একজন শিক্ষার্থী গড়ে প্রায় ২৬টি ভুল তথ্য দেখেন। এই উপাত্তের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অতিমাত্রায় সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের সাথে ভুল তথ্যে প্রকটতার সীমিত মাত্রায় ধনাত্মক সম্পর্ক বিদ্যমান। অর্থাৎ, সামাজিক মাধ্যমে অধিক সময় ব্যয় করলে অপতথ্যের সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকি সামান্য হলেও বৃদ্ধি পেতে পারে, কিন্তু এটি একমাত্র প্রধান কারণ নয়।

ফ্যাক্টচেকিংয়ের গুরুত্ব অনুধাবন করা সত্ত্বেও এটিকে অভ্যাসে পরিণত করার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে দ্বিধা পরিলক্ষিত হয়। জরিপে উঠে এসেছে, প্রায় ৬৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ‘মাঝেমধ্যে’ এবং ‘প্রায়ই’ তথ্য যাচাই করে থাকেন। তবে, এই প্রক্রিয়াকে একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করেছেন মাত্র ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থী।

জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭৮ শতাংশই তথ্য যাচাইয়ে কোনো টুলস ব্যবহার করেন না বলে জানিয়েছেন। যারা টুলস ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে মাত্র চার শতাংশ শিক্ষার্থী মেটাডাটা বিশ্লেষণ, রিভার্স সার্চ এবং এআই চ্যাটবটের মতো টুলসগুলো ব্যবহার করেন। বাকিরা তথ্য যাচাইয়ের জন্য ইন্টারনেটে সার্চ করা, অনলাইন ভিত্তিক নিউজ পোর্টাল, ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করে থাকেন।
অপতথ্য দেখা এবং ফ্যাক্টচেকিং দক্ষতার লিঙ্গভিত্তিক ভিন্নতা
জরিপে দেখা গেছে, নারী-পুরুষ উভয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায় সমপরিমাণ সময় ব্যয় করেন, কিন্তু নারীরা পুরুষের তুলনায় কম অপতথ্যের মুখোমুখি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খোরশেদ আলম রিউমর স্ক্যানারকে জানান, “নারী ও পুরুষের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া এবং জেন্ডারিং এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামাজিক কাঠামোর ভেতর গড়ে ওঠা আগ্রহ ও আচরণগত পার্থক্যের কারণে তথ্য গ্রহণের ধরণও ভিন্ন হয়। ফলে যেসব ক্ষেত্রে অপতথ্যের বিস্তার তুলনামূলক বেশি, সেসব ক্ষেত্রে নারীদের সম্পৃক্ততা কম থাকায় তারা এসব গুজবের মুখোমুখিও কম হন। সাধারণভাবে দেখা যায়, নারীদের রাজনৈতিক বিষয়সহ এমন কিছু ক্ষেত্রে আগ্রহ তুলনামূলক কম, যেখানে অপতথ্যের প্রচার বেশি ঘটে।”

অপরদিকে ফ্যাক্টচেকিং দক্ষতায়ও নারীরা পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে আছে। ড. খোরশেদ আলমের মতে, নারীরা তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি বিশ্বাসপ্রবণ। “আমাদের সমাজের বিভিন্ন স্তরে এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও নারীদের সামাজিক এক্সপোজার তুলনামূলকভাবে কম। তারা সাধারণত একটি সীমিত সামাজিক পরিসরের মধ্যে বিচরণ করেন এবং অপেক্ষাকৃত অন্তর্মুখী হয়ে থাকেন। বিপরীতে, পুরুষ শিক্ষার্থীরা বেশি বহির্মুখী হন এবং নানা ধরনের সামাজিক সার্কেল বা নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকেন। নারীদের কম মিথস্ক্রিয়া ও সীমিত এক্সপোজার তাদের বিশ্বাসপ্রবণ করে তুলতে পারে।”
সোশ্যাল নেটওয়ার্ক থিওরির আলোকে ড. আলম ব্যাখ্যা করেন, “কোনো তথ্য বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে পুরুষরা সেটিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করেন এবং তাদের চারপাশের সামাজিক নেটওয়ার্ক বা সার্কেলকে ব্যবহার করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। নারীরা যেহেতু কিছুটা বেশি বিশ্বাসপ্রবণ, ফলে তারা অনেক সময় কোনো সংবাদকে তাৎক্ষণিকভাবে সত্য ধরে নেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তা যাচাই করতে যান না। পরে ভুলটি বুঝতে পারলেও প্রাথমিকভাবে তারা সেটিকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ করেন। এর কারণে ফ্যাক্টচেকিং দক্ষতার ক্ষেত্রেও তারা কিছুটা পিছিয়ে থাকতে পারেন।”
বেশি দক্ষ মানেই বেশি ফ্যাক্টচেক নয়
জরিপের ফলাফলগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফ্যাক্টচেকিংয়ের দক্ষতা ও নিয়মিত ফ্যাক্টচেকিং করার মাত্রার মধ্যে অত্যন্ত দুর্বল সম্পর্ক বিদ্যমান, যা পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ নয়। অর্থাৎ, যাদের ফ্যাক্টচেকিং দক্ষতা রয়েছে তারাও নিয়মিতভাবে ফ্যাক্টচেক করেন না। এটি দক্ষতা ও তার ব্যবহারিক প্রয়োগের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধানের ইঙ্গিত দেয়।

আবার, প্রায় ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ফ্যাক্টচেকিংকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেও তারা নিয়মিত ফ্যাক্টচেক করেন না। এক্ষেত্রেও গুরুত্ব বনাম নিয়মিত ফ্যাক্টচেক করার প্রবণতার মধ্যে অতি দুর্বল সম্পর্ক পাওয়া গেছে, যা মূল্যবোধ ও আচরণের মধ্যেকার অসঙ্গতিকে স্পষ্ট করে তোলে।
শিক্ষার্থীদের ফ্যাক্টচেকিং দক্ষতার বাস্তবিক পার্থক্য
জরিপে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা একদিকে নিজেদের ফ্যাক্টচেকিং সম্পর্কিত দক্ষতার আত্মমূল্যায়ন করেছেন, অন্যদিকে তিনটি মানদণ্ডভিত্তিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মাধ্যমে তারা পৃথকভাবে ফ্যাক্টচেকিং দক্ষতার মূল্যায়নে অংশ নিয়েছেন। এই দুই সূচক একত্রে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ও আত্ম-উপলব্ধ দক্ষতার পার্থক্য অনুসন্ধানের সুযোগ করে দেয়।

দেখা গেছে ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের দক্ষতার সঠিক মূল্যায়ন করেছেন। ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী নিজের দক্ষতার চেয়ে বেশি মূল্যায়ন করেছেন এবং ৩৫ শতাংশ নিজের দক্ষতার চেয়ে তাকে কম মূল্যায়ন করেছেন।
গণমাধ্যম বনাম ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানে আস্থার হার
জরিপে অংশ নেওয়া ঢাবি শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, মূলধারার সংবাদ মাধ্যমের প্রতি তারা কতটা আস্থা রাখেন। উত্তরে ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থী জানান যে গণমাধ্যমের প্রতি তাদের ‘কিছুটা আস্থা’ রয়েছে। একদমই আস্থা নেই এমন শিক্ষার্থীর হার প্রায় আট শতাংশ। ফ্যাক্টচেকিংয়ের জন্য জেমিনি বা চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টুলগুলোকে নির্ভরযোগ্য মনে করেন কিনা এমন প্রশ্নে প্রায় ৪৯ শতাংশ শিক্ষার্থীই জানিয়েছেন যে কিছুটা নির্ভরযোগ্যতা রয়েছে। অনির্ভরযোগ্য বলে মতামত এসেছে প্রায় ২০ শতাংশ শিক্ষার্থীর।

প্রায় ৫৩ শতাংশ শিক্ষার্থীর মতে, গুজব প্রতিরোধের দায়িত্ব ব্যক্তিগতভাবে সকল নাগরিকের। প্রায় ২৭ শতাংশের মতে, সরকার, গণমাধ্যম, ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সকলের সমন্বয়ে গুজব প্রতিরোধ করা প্রয়োজন।
দেশের ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা কেমন তা জানতে জরিপে ১ থেকে ৫ পর্যন্ত রেটিং ঠিক করে দিয়ে শিক্ষার্থীদের রেটিং করতে বলা হলে প্রায় ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ৩ রেটিং দেন।
রিউমর স্ক্যানারের এই জরিপে ঢাবি শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, কোন ধরনের বিষয়বস্তু নিয়ে তারা ফ্যাক্টচেক ক্যাম্পেইন দেখতে আগ্রহী। জবাবে ৪৩ শতাংশ শিক্ষার্থীই রাজনৈতিক মিথ্যে তথ্যকে ফ্যাক্টচেকিং ক্যাম্পেইনের বিষয় হিসেবে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এই আগ্রহ দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অপতথ্য পরিস্থিতির সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে, চলতি বছর (২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) শনাক্ত হওয়া ৩৯৬৫টি ভুল তথ্যের মধ্যে রাজনৈতিক অপতথ্যই ছিল প্রায় ৫২ শতাংশ, যা শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা এবং বাস্তব সমস্যার প্রতি তাদের আগ্রহকে প্রতিফলিত করে।
কেস স্টাডি ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
ঢাবির মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের একজন শিক্ষার্থী জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের নামে প্রচারিত একটি গুজবকে বিশ্বাস করে তার ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে শেয়ার করেছিলেন। এই দ্রুত শেয়ারের কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে বিষয়টি যেহেতু একজন ‘আইকন’ প্লেয়ারের অগ্রহণযোগ্য আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, তাই ঘটনার গুরুত্ব এবং আবেগ প্রাথমিক বিশ্বাসকে চালিত করেছিল। গুজবটি কেন প্রাথমিক পর্যায়ে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল, তার দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, সংবাদটি কেবল একটি নয় বরং একাধিক প্রথম সারির এবং ‘বিশ্বস্ত’ বলে বিবেচিত ওয়েব পোর্টাল থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। উৎসের এই ব্যাপকতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা সংবাদের বৈধতা সম্পর্কে শিক্ষার্থীর মনে দৃঢ় আস্থা তৈরি করেছিল। দ্বিতীয়ত, সংবাদের সমর্থনে একটি কল রেকর্ডের খণ্ডিত অংশ প্রচার করা হয়েছিল। এই আংশিক, বিচ্ছিন্ন এবং প্রমাণের মতো উপস্থাপনা সংবাদের সত্যতা সম্পর্কে একটি দ্রুত কিন্তু ভুল ধারণা তৈরি করতে সহায়ক হয়েছিল। যখন এই শিক্ষার্থী জানতে পারেন যে সংবাদটি ছিল নিছক গুজব, তিনি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে তার পোস্টটি ডিলিট করে দেন। তবে, এই সংশোধনী প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। তিনি নিজে থেকে ভুল তথ্যের বিপরীতে সঠিক সংবাদটি বা গুজবটির অসত্যতা নিয়ে কোনো পোস্ট করেননি। এই ভুল অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ উক্ত শিক্ষার্থীর ডিজিটাল সংবাদ গ্রহণ এবং তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাসে গভীর এবং ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। পরবর্তী সময় থেকে কোনো ‘হইচই ফেলে দেওয়া’ নিউজ বা একপাক্ষিক ভাবে উপস্থাপিত তথ্যকে হুট করে বিশ্বাস করেন না তিনি। তিনি এখন যাচাই না করা বা একপাক্ষিক তথ্য শেয়ার দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা এবং একই সঙ্গে তিন থেকে চারটি প্রথম সারির মূলধারার সংবাদ মাধ্যম থেকে বিষয়টি ক্রসচেক করে নেওয়ার মতো পদ্ধতি অবলম্বন করে থাকে। তার এই পরিবর্তন সমালোচনামূলক তথ্য যাচাইয়ের প্রতি তার গুরুত্ব বৃদ্ধির প্রমাণ দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়টির বাংলা বিভাগের একজন শিক্ষার্থীর হিজাব সংক্রান্ত একটি ইস্যু নিয়ে করা পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর সেই শিক্ষার্থী বিপুল সংখ্যক মানুষের অপতথ্যমূলক পোস্টের শিকার হন। তার পুরোনো ছবি ব্যবহার করা ছাড়াও তার নামে বিভিন্ন মিথ্যা অভিযোগ এনে পোস্ট হতে থাকে, যার ফলে এই শিক্ষার্থী পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এই মানসিক চাপ এতটাই তীব্র ছিল যে তিনি সাময়িকভাবে সামাজিক মাধ্যম থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য হন। শুধুই মানসিক চাপ, শারীরিক নিরাপত্তা নিয়েও সে ও তার পরিবার চিন্তিত হয়ে পড়েছিল। তার পরিবার থেকে তাকে বোরকা ও হিজাবের স্টাইল পরিবর্তন করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে কেউ তাকে সহজে চিনতে না পারে এবং কটূক্তি বা ক্ষতি করতে না পারে। এই ঘটনা অপতথ্যের প্রচার অনলাইনে শুরু হয়ে অফলাইন পর্যন্ত গিয়ে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা হুমকির মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি করতে পারে তার প্রমাণ দেয়। অবশেষে যখন এই ঘটনার একটি সমাধান আসে, তখন উক্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে মানসিক শক্তির পুনরুদ্ধার ঘটে। তিনি দৃঢ়ভাবে জানান, “আমি যদি ন্যায়ের দিকে থাকি তাহলে আমার নামে যত অপতথ্যই ছড়ানো হোক আমি স্ট্রং থাকব।” এই উপলব্ধি নির্দেশ করে যে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেলেও ব্যক্তিগত দৃঢ়তা ডিজিটাল সহিংসতার মোকাবিলায় মানসিক প্রতিরক্ষা তৈরি করতে পারে। এই বিশ্লেষণ জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার পাশাপাশি মানসিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার গুরুত্বের ওপরও জোর দেয়।
এই জরিপভিত্তিক বিশ্লেষণটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল তথ্যপরিবেশে অপতথ্য ও ভ্রান্ত তথ্য মোকাবিলার বর্তমান বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। বিশ্লেষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফ্যাক্টচেকিংয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে উচ্চ মাত্রার সচেতনতা বিদ্যমান থাকলেও সেই সচেতনতা এখনো নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাসে রূপ নিতে পারেনি। ফলে জ্ঞান, দক্ষতা ও আচরণের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ব্যবধান রয়ে গেছে।
বিশ্লেষণটি আরও নির্দেশ করে যে কেবল প্রযুক্তিগত বা তাত্ত্বিক দক্ষতা অর্জন যথেষ্ট নয় বরং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, আচরণগত প্রণোদনা এবং কাঠামোবদ্ধ শিক্ষার সমন্বয় ছাড়া ফ্যাক্টচেকিংকে টেকসই চর্চায় পরিণত করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে এআই-নির্ভর কনটেন্ট ও ডিপফেক প্রযুক্তির প্রসারের প্রেক্ষাপটে আধুনিক যাচাইকরণ পদ্ধতি ও টুল ব্যবহারের দক্ষতা ভবিষ্যৎ নাগরিক সক্ষমতার একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
অপতথ্যের উচ্চমাত্রিক উপস্থিতির কারণে নারীদের মিডিয়া লিটারেসি ও ফ্যাক্টচেকিং দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি কিনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফ্যাক্টচেকিং কোর্স বাধ্যতমূলক করা উচিত কিনা এ প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খোরশেদ আলম রিউমর স্ক্যানারকে বলেন, “অপতথ্যের বিস্তার মোকাবিলায় নারীদের জন্য আলাদা কোনো উদ্যোগের চেয়ে সামগ্রিকভাবে ফ্যাক্টচেকিং ও মিডিয়া লিটারেসি জোরদার করাই বেশি কার্যকর। মিডিয়া লিটারেসি বাড়ালে নারী ও পুরুষ উভয়ই সমানভাবে উপকৃত হবে।”
তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, এ উদ্যোগের সূচনা হওয়া উচিত প্রাথমিক স্কুল পর্যায় থেকে। পাঠ্যবইয়ে ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি বিষয়ক অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংবাদ যাচাইয়ের অভ্যাস ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠবে। পাশাপাশি বিটিভিসহ জাতীয় গণমাধ্যমে মিডিয়া লিটারেসি বিষয়ক অনুষ্ঠান, বিভিন্ন ক্যাম্পেইন, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে।”
ড. খোরশেদ আলমের মতে, এসব কাজ মূলত স্কুল পর্যায়ের হলেও বিদ্যমান কাঠামোগুলোকে কাজে লাগানো জরুরি। যেমন, প্রত্যেক ইউনিয়নের ডিজিটাল সেন্টার, জেলা পর্যায়ের সাইবার সিকিউরিটি সেল এবং জেলা তথ্য অফিসগুলো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। সমন্বিতভাবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সমাজে মিডিয়া লিটারেসির একটি সাধারণ বোধ তৈরি হবে।
শিক্ষার্থীদের ফ্যাক্টচেকিং দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী রিউমর স্ক্যানারকে বলেন, “উন্নত দেশগুলোতে ক্লাস ফোর-ফাইভ থেকেই শিক্ষার্থীদের মিডিয়া লিটারেসি শেখানো হয়। সেখানে শিশুদের শেখানো হয় কোন ধরনের কনটেন্ট নিরাপদ নয়, ডিজিটাল সিকিউরিটি কী, ডিজিটাল ফুটপ্রিন্টের ধারণা, WHOIS কীভাবে ব্যবহার করতে হয় ইত্যাদি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।”
এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তির উত্থানে সৃষ্ট নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন এমন প্রশ্নের জবাবে ড. চৌধুরী বলছেন, “বাংলাদেশের প্রাথমিক কম্পিউটার শিক্ষার ধারা মূলত টায়পিং বা এক্সেল শেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আজও একই প্রবণতা বিদ্যমান।” তিনি বলেন, “এআই শেখানোর নামে এখানে প্রম্পট মুখস্থ করানো হয়, যা বাস্তব দক্ষতা অর্জনে কোনো সহায়তা করে না।”
সার্বিকভাবে, এটি স্পষ্ট করে যে অপতথ্য প্রতিরোধ কোনো একক পক্ষের দায়িত্ব নয়। ব্যক্তিগত নাগরিক সচেতনতা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সংস্কার, রাষ্ট্রের নীতিগত উদ্যোগ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহিমূলক ভূমিকার সমন্বিত প্রয়াসই কেবল অপতথ্য মোকাবিলায় ইতিবাচক ফলাফল নিশ্চিত করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে জরিপের ফলাফল ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণ, শিক্ষা কার্যক্রম এবং মিডিয়া লিটারেসি উদ্যোগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণভিত্তিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
কাজের পদ্ধতি
জরিপের তথ্য সংগ্রহের জন্য গুগল ফর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সংগৃহীত উপাত্ত পরবর্তী সময়ে সংখ্যাগত পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা হয়। পাশাপাশি জরিপে অন্তর্ভুক্ত ওপেন এনডেড প্রশ্নের উত্তরগুলো এবং কেস স্টাডির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অপতথ্য সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা গুণগত পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাঠকের সহজবোধ্যতার জন্য উপাত্তগুলোকে বিভিন্ন বিভাগে ভাগ করে গ্রাফ, চার্ট এবং বিশ্লেষণধর্মী বর্ণনার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপাত্ত বিশ্লেষণ ও উপস্থাপনার ক্ষেত্রে এসপিএসএস এবং আরস্টুডিও সফটওয়্যারের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। গবেষণাকে আরও ব্যাখ্যামূলক ও প্রাসঙ্গিক করার লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই জন শিক্ষকের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে। সাক্ষাৎকার থেকে প্রাপ্ত মতামতগুলো ভুল তথ্য বিস্তারের কারণ এবং তা মোকাবিলায় করণীয় বিষয় বিশ্লেষণে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। জরিপটি পরিচালনার জন্য সুবিধাজনক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এ পদ্ধতি নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করা এবং সহজপ্রাপ্য অংশগ্রহণকারীদের অন্তর্ভুক্ত করা। এর ফলে নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে সহজপ্রাপ্য ১০১ জন শিক্ষার্থীর প্রতিক্রিয়াকে গবেষণার নমুনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। নমুনায়ন পদ্ধতিটি যেহেতু অ-দৈব, তাই ফলাফলকে বৃহত্তর জনসংখ্যার ওপর সাধারণীকরণের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। তবুও এই নমুনা থেকে প্রাপ্ত তথ্য শিক্ষার্থীদের তথ্য যাচাই-সংক্রান্ত ধারণা, অভ্যাস ও মনোভাব সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করতে সক্ষম।





