সম্প্রতি অনলাইনে দাবি প্রচার করা হয়েছে, ‘ইউনুস এবং তাসলিমা বেগম যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। এর মানে ইউনুস নোবেলের অর্ধেক পেয়েছিলেন, আর তাসলিমা পেয়েছিলেন বাকি অর্ধেক।.. ২০০৭ সালে ড. ইউনূস তাসলিমা বেগমকে জোড়পূর্বক গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বিতাড়িত করে নোবেলের খ্যাতিও এককভাবে জবরদখল করে।’

এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
এরূপ দাবিতে এক্সে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
এরূপ দাবিতে ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
এরূপ দাবিতে থ্রেডসে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৬ সালে ড. ইউনূসের সাথে তাসলিমা বেগম যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন শীর্ষক দাবি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে ২০০৬ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার প্রতিষ্ঠা করা গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করে, এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে তাসলিমা বেগম গ্রামীণ ব্যাংকের পুরস্কার গ্রহণ করেন। তবে, নোবেল পুরস্কারে তাসলিমা বেগমের কোনো অংশীদারত্ব নেই। তাছাড়া, ২০০৭ সালে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে তাসলিমা বেগমকে জোরপূর্বক বিতাড়িত করার দাবিও সঠিক নয়৷ প্রকৃতপক্ষে তিনি ২০০৯ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড মেম্বার ছিলেন।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে নোবেল পুরস্কার এর ওয়েবসাইটে ‘The Nobel Peace Prize Award Ceremony and Concert 2006’ শিরোনামে প্রচারিত ১৫টি ছবি পাওয়া যায়। ছবিগুলোর প্রথম ছবির সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ছবির মিল পাওয়া যায়। ছবির বর্ণনায় বলা হয়, ‘মোসাম্মাৎ তাসলিমা বেগম (বামে), গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধিত্বকারী, এবং মুহাম্মদ ইউনুস তাদের নোবেল শান্তি পুরস্কারের মেডেল ও ডিপ্লোমা হাতে পোজ দিচ্ছেন।’ (অনূদিত)

পরবর্তীতে নোবেল পুরস্কারের ওয়েবসাইটে ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার এর সারাংশ অংশে পাওয়া যায়, ‘২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার যৌথভাবে মুহাম্মদ ইউনুস এবং গ্রামীণ ব্যাংককে প্রদান করা হয়েছিল “তাদের তৃণমূল পর্যায় থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন সৃষ্টির প্রচেষ্টার জন্য।”’ (অনূদিত)। পাশাপাশি, ওয়েবসাইটে ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রেস রিলিজেরও সংযুক্তি পাওয়া যায়, তবে তাতেও ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক ব্যতীত তাসলিমা বেগমের নামের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
এছাড়াও, এ বিষয়ে সেসময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা, রয়টার্স, সিবিএস নিউজের মতো নানা গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হতে দেখা যায়। সবগুলোতেই বলা হয়, ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক থেকে দেওয়া হয়েছে। এতে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস তার নিজের অংশের পুরস্কার ও গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাসলিমা বেগম পুরস্কার গ্রহণ করেন। তবে নোবেলজয়ীর তালিকায় তাসলিমা বেগমের নাম উল্লেখ করা হয়নি।
তাছাড়া, ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের নোবেল জয়ের এক দশক পূর্তি উপলক্ষ্যে ২০১৬ সালে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘..২০০৬ সালের ১৩ অক্টোবর নরওয়ের নোবেল কমিটি শান্তিতে অবদান রাখার জন্য গ্রামীণ ব্যাংক ও এর প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেয়। পরে ওই বছরের ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের রাজধানী অসলোতে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি তাসলিমা বেগম এ পুরস্কার গ্রহণ করেন।’
অর্থাৎ, এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ২০০৬ সালে ড. ইউনূসের সাথে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার তাসলিমা বেগম পেয়েছিলেন শীর্ষক দাবি সঠিক নয়।
পরবর্তীতে তাসলিমা বেগমের বিষয়ে অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি স্টার’ এর ওয়েবসাইট আর্কাইভে তাসলিমা বেগমকে নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তাসলিমা বেগম ১৯৯২ সালে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে প্রথম ১,৫০০ টাকা ঋণ নিয়ে একটি ছাগল কিনেছিলেন। সেই থেকেই তিনি সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তীতে ব্যাংকের নির্বাচিত বোর্ড সদস্যদের একজন হন। গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে তার অভিজ্ঞতা এবং তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের গল্প এক ওয়ার্কশপে উপস্থাপনের মাধ্যমে তিনি শাখা প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি আঞ্চলিক এবং এরিয়া পর্যায়ের প্রতিনিধি নির্বাচিত হন এবং শেষ পর্যন্ত গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড অব ডিরেক্টর্সের সদস্য হিসেবে মনোনীত হন। তিনি ২০০৫ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত চার বছর বোর্ড মেম্বার/সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৩ অক্টোবর ২০০৬ সালে নোবেল কমিটি ঘোষণা করে যে নোবেল পুরস্কার গ্রামীণ ব্যাংক ও ড. ইউনুসকে প্রদান করা হবে। এরপর গ্রামীণ ব্যাংকের সব ইউনিট প্রধানরা তাসলিমাকে পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে ব্যাংকের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে মনোনীত করেন।
এছাড়াও, ‘দ্যা ডেইলি স্টার’ এ ২০১১ সালে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ড. ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে শুনে তিনি মর্মাহত হয়েছেন। সরকার ড. ইউনূসের সাথে আরো ভালো আচরণ করতে পারতো বলে ‘দ্য ডেইলি স্টার’ এর প্রতিনিধির কাছে তিনি মতপ্রকাশ করেন৷ পাশাপাশি, তার ও আরো অনেকের জীবনে অবদান রাখার জন্য ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রশংসা করেন তিনি। তবে প্রতিবেদনে তাসলিমা বেগমকে গ্রামীণ ব্যাংককে জোরপূর্বক বিতাড়িত করার কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি। বরং, ২০০৫-০৯ সাল পর্যন্ত বোর্ড সদস্য হিসেবে তাসলিমা বেগমের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে উল্লেখ পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, ২০০৭ সালে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে তাসলিমা বেগমকে জোরপূর্বক বিতাড়িত করা হয়নি।
সুতরাং, ড. ইউনূসের সাথে তাসলিমা বেগমের যৌথভাবে নোবেল তাসলিমা বেগম পাওয়া এবং তাসলিমা বেগমকে জোরপূর্বক গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বিতাড়িত করার দাবিগুলো মিথ্যা।
তথ্যসূত্র
- The Nobel Prize – The Nobel Peace Prize Award Ceremony and Concert 2006
- The Nobel Prize – Nobel Peace Prize 2006
- The Nobel Prize – Press release
- Al Jazeera – Yunus: Poverty threatens peace
- Reuters – Yunus and Grameen Bank receive Nobel Peace Prize
- CBS News – Nobels All Around
- Prothom Alo – নোবেল জয়ের এক দশক
- The Daily Star – Taslima Begum’s Tale of Success
- The Daily Star – Nobel receiver in anguish
- Rumor Scanner’s analysis





