পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে গত ২৭ নভেম্বর বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার কিছু ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এক ভিডিওতে জামায়াত প্রার্থী আবু তালেব মন্ডলের গাড়ীতে হামলা হতে দেখা যায়। অপর এক ভিডিওতে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বাজারের মধ্যে ওই গাড়িতে হামলার চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। ওই একই স্থানে এক ব্যক্তিকে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরতে দেখা যায়। যেহেতু ভিডিওতে দৃশ্যত জামায়াত প্রার্থীর গাড়িতে হামলা দেখা যায়, তাই প্রাথমিকভাবে ছবিটি মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘জামায়াত প্রার্থীর ওপরে বিএনপির হামলা’ ঘটনায় অস্ত্রের ছবি হিসেবে প্রচার ঘটে।
এরপরে ছবির ব্যক্তি নিয়ে বিভিন্ন রকম বর্ননা দেখা যায়। তাকে বিভিন্ন পোস্টে বিএনপির দাবি করা হয়। বিভিন্ন পোস্টে জামায়াতের দাবি করা হয়। বেশকিছু পোস্টে তাকে পাবনা বুলবুল কলেজের শাখা ছাত্রদলের পাঠাগার সম্পাদক হিসেবে দাবি করা হয়।

এমন কিছু ফেসবুক পোস্ট এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে। এক্সে প্রচারিত একটি পোস্ট এখানে।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ঈশ্বরদীতে অস্ত্র হাতে ভাইরাল যুবক বুলবুল কলেজ ছাত্রদলের নয় বরং তুষার নামের ওই যুবক জামায়াত প্রার্থী আবু তালেব মন্ডলেরই কর্মী।
অনুসন্ধানে বিভিন্ন ফেসবুক পোস্টে অস্ত্র হাতের ওই যুবককে তুষার এবং তার বাড়ী ঈশ্বরদীর ভেলুপাড়া এলাকার তাহেরের ছেলে উল্লেখ করতে দেখা যায়।
সেই সূত্র ধরে অনুসন্ধানে ‘পুলিশী তল্লাশির ভয়ে ঈশ্বরদীতে মাদক ব্যবসায়ীর পুকুরে ঝাঁপ’ শিরোনামের ২০২০ সালের একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে “ঈশ্বরদীতে পুলিশী তল্লাশির ভয়ে পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছিলেন তুষার (১৯) নামের এক তরুণ। সে উপজেলার ভেলুপাড়া এলাকার আবু তাহেরের ছেলে। পুলিশ জানায়, ওই ব্যক্তির পকেটে ৫ বোতল ফেন্সিডিল পাওয়া গেছে” উল্লেখ করা হয়।
২০২০ সালের ওই আটক ব্যক্তির তথ্যের সাথে সম্প্রতি অস্ত্র উঁচিয়ে ভাইরাল তুষারের মিল রয়েছে। এছাড়াও প্রতিবেদনে যুক্ত ছবির সাথে তার চেহারারও মিল রয়েছে।
পরবর্তীতে অনুসন্ধান করতে গিয়ে Sotter Pothe নামের একটি আইডির ফেসবুক পোস্ট নজরে আসে, যেখানে তিনি তুষারসহ কয়েকজনের ছবি প্রচার করে “জামাত ভন্ডদের দল তা আমি একমাস আগে এই তুষারের ছবিসহ পোস্ট করি” ক্যাপশনে পোস্ট করেছেন।
সত্যের পথে আইডিতে গত ২৩ অক্টোবর দেয়া উল্লেখিত পোস্টটিও পাওয়া যায়, যেখানে তিনি জামায়াত প্রার্থীর প্রচারণায় তুষার থাকার কয়েকটি ছবি এবং আরো কিছু ব্যক্তির ছবি যুক্ত করে “আওয়ামীলীগকে পুর্নবাসন করছে জামায়াত” বলে অভিযোগ তোলেন।
Sotter Pothe ফেসবুক আইডিটি তার পোস্টে দাবি করেন তুষার আগে যুবলীগ করতো, ৫ আগস্টের পর সে জামায়াতের আমীর তালেব মন্ডলের ভাতিজা মামুনের কর্মী হিসেবে কাজ করে।
সত্যের পথে ফেসবুক আইডিটির সাথে যোগাযোগ করে তুষার এবং উল্লেখিত মামুন মন্ডলের ফেসবুক আইডি সংগ্রহ করে রিউমর স্ক্যানার। তুষারের ফেসবুক আইডিতে রাজনৈতিক কার্যক্রমের কিংবা রাজনীতি কেন্দ্রিক কোন পোস্ট দেখা যায়নি।
মামুন মন্ডলের ফেসবুক আইডি Md Mamun এ পাবনা ৪ আসনের জামায়াত প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আবু তালেব মন্ডলের নির্বাচনে বিভিন্ন কর্মসূচিতে তুষারকে দেখতে পাওয়া যায়।
মামুন মন্ডলের ১৪ অক্টোবরের একটি ফেসবুক পোস্টে “ঈশ্বরদী পোস্ট অফিস মোড় হতে রেলগেট গণসংযোগ করেন আমাদের সবার প্রিয় মুখ ঈশ্বরদী আটঘরিয়ার নয়নের মনি অধ্যাপক আবু তালেব মন্ডলসহ আমরা..” ক্যাপশনে কয়েকটি ছবি ও ভিডিও পোস্ট করেন। ওই ছবি ও ভিডিওতে তুষারকে দেখা যায়।
গত ১৪ আগস্টের একটি পোস্টে যুক্ত ছবিতে তালেব মন্ডলের পেছনে তুষারকে দেখা যায়। ওই পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়, “আলহাজ্ব টেক্সটাইলস মিলস উচ্চ বিদ্যালয়ে আন্ত বার্ষিক ফুটবল টুর্নামেন্টে স্কুলের কচিকাঁচা ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে উদ্বোধনীয় ম্যাচে প্রধান অতিথি অধ্যাপক আবু তালেব মন্ডলসহ আমরা এলাকার যুব সমাজ, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ নিয়ে আয়োজক কমিটি একাংশ।”

এর মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তুষার বর্তমানে জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক আবু তালেব মন্ডলের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে কর্মী হিসেবে কাজ করছেন।
অস্ত্র উঁচিয়ে ভাইরাল ভিডিওতেও তাকে জামায়াতের কর্মীদের অংশেই দেখা যায়। ভিডিওতে আলহাজ্ব মোড় এলাকায় জামায়াত এমপি প্রার্থী আবু তালেব মন্ডলের গাড়ি হামলার শিকার হলে তুষারকে সেসময় এগিয়ে আসতে দেখা যায় এবং ভাইরাল ভিডিওতে একটা মুহূর্তে তাকে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরতে দেখা যায়। তবে, বিভিন্ন পোস্টে তুষারের গুলি করার দাবিও করা হলেও, তার গুলি করার কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
অস্ত্র হাতের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অনেক পোস্টে তুষারকে পাবনা শহীদ বুলবুল কলেজ ছাত্রদলের পাঠাগার সম্পাদক হিসেবে দাবি করা হয়। তবে, অনুসন্ধানে তুষার শহীদ বুলবুল কলেজ ছাত্রদলের কেউ বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
শহীদ বুলবুল কলেজ শাখা ছাত্রদলের বর্তমান পূর্ণাঙ্গ কোনো কমিটি নেই। ২০২০ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয়, ওই কমিটিই এখনো কার্যকরী রয়েছে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। ২০২০ সালের ওই কমিটিতে আহবায়ক এবং সদস্য সচিব এর সাথে ৮ জন যুগ্ম আহ্বায়ক এবং ১২ জন সদস্য রয়েছে। সেখানে তুষার নামের কেউ নেই এবং পাঠাগার সম্পাদক নামেও কোনো কিছু নেই। বুলবুল কলেজ শাখা ছাত্রদলের এক কর্মী এবং বর্তমানে সাংগঠনিক সম্পাদক পদপ্রার্থী শাওন হোসাইন ২০২০ সালের ওই আহ্বায়ক কমিটির পর আর কোন কমিটি হয়নি বলে নিশ্চিত করে তুষার নামের ওই যুবক ওই কলেজেরই কেউ নেই বলে জানিয়েছেন।
অর্থাৎ, অস্ত্র হাতে ভাইরাল যুবক তুষার পাবনার শহীদ বুলবুল সরকারি কলেজ ছাত্রদলের কেউ নয় বরং জামায়াত প্রার্থী আবু তালেব মন্ডলেরই কর্মী।
সুতরাং, ঈশ্বরদীতে অস্ত্র হাতে ভাইরাল যুবক তুষার ছাত্রদলের তথা বিএনপি’র কর্মী এই দাবিটি মিথ্যা।
তথ্যসূত্র
- Rumor Scanner Investigation
- Sotter Pothe Facebook ID
- Md Mamun’s posts





