সম্প্রতি অনলাইনে দুইটি ছবি প্রচার করে ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে, ‘বাংলাদেশী স্বামী-স্ত্রী বিমানে করে গিয়েছিলো ভারতের চেন্নাই, তিনমাস সেখানে চিকিৎসা শেষে টাকা কম থাকাতে লোকাল বিমানে কলকাতা এসেছিলো। তারপর তারা বাই রোডে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চেয়েছিলো। ভাগ্য তাদের খারাপ ছিলো, বাসে পর্যাপ্ত যাত্রী না হওয়ার কারনে তারা নির্দিষ্ট সময়ে বাই রোডে আসতে পারেনি। বাধ্য হয়ে হোটেলে উঠতে হয়েছিলো, বিপত্তি বাধে যখন স্বামী নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে যায়। সেখানে উগ্র হিন্দুরা হঠাৎ আক্রমন করে বসে, ফলে সাইদুর নামে বাংলাদেশী রোগী সেখানেই হিন্দুদের লাথি আর ঘুসিতে প্রান হারায়। ঘটনাটি গত শুক্রবারে ঘটেছে, কোন পত্রিকা বা মিডিয়া আসল সত্যটা প্রকাশ করেনি’।
আলোচিত দাবিতে প্রচারিত পোস্টে দাবির সমর্থনে দুইটি কোলাজ যুক্ত করা হয়েছে, যার প্রতিটিতে দুইটি করে ছবি রয়েছে। প্রথম কোলাজে একটি ভিড়ের মধ্যে থাকা দুইটি ছবি দেখা যায়। দ্বিতীয় কোলাজের বাম পাশে একজন নারীকে সংবাদমাধ্যমের মাইকের সামনে এবং ডান পাশে একজন ব্যক্তির ছবি রয়েছে।

এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়া অবধি আলোচিত দাবিতে প্রচারিত উপরোল্লিখিত পোস্টগুলোতে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬০ হাজারটি পৃথক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।
এরূপ দাবিতে এক্সে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
এরূপ দাবিতে ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যাওয়া সাইদুর নামে এমন কোনো বাংলাদেশি নাগরিককে সম্প্রতি গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়নি এবং প্রচারিত ছবিগুলোর সঙ্গে আলোচিত দাবির কোনো সম্পৃক্ততা নেই। প্রকৃতপক্ষে, প্রথম ছবিটি ভারতে একটি মসজিদের সামনে মুসলমানদের ওপর হামলার সংবাদের প্রেক্ষিতে গত বছরের মার্চে দেশীয় গণমাধ্যম ইনকিলাবে প্রকাশিত হয়। আর দ্বিতীয় ছবিটি গত বছরের মার্চে ভারতের উত্তর প্রদেশের উন্নাওয়ে হোলির সময় শরীফ নামে এক মুসলিম ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনাসংক্রান্ত সংবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
আলোচিত দাবির সঙ্গে প্রচারিত প্রথম ছবির বিষয়ে অনুসন্ধানে, দেশিয় গণমাধ্যম ইনকিলাব এর ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালের ১৪ মার্চে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে সংযুক্ত ছবির সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত প্রথম ছবির হুবহু মিল পাওয়া যায়।

ইনকিলাবের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘..নামাজ পড়ে বের হওয়ার সময় মসজিদের সামনেই মুসল্লিদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছে ভারতীয় কট্টর হিন্দুত্ববাদিরা। যে ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যমে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ভারতের একটি মসজিদের সামনে হঠাৎ করেই কট্টর হিন্দুত্ববাদি একটি দল নামাজ পড়ে বের হওয়া মুসল্লিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের মারধর করে আর উচ্চ স্বরে জয় শ্রী রাম বলতে থাকে, তাদের হাতে ছিলো মদের বোতলও। ভিডিওটি রীতিমতো এখন ভাইরাল।..’ উক্ত প্রতিবেদনে আলোচিত দাবির কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে দ্বিতীয় ছবির বিষয়ে অনুসন্ধানে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্যা অবজারভার পোস্ট’ এর ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালের ১৫ মার্চে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে সংযুক্ত ছবির সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত দ্বিতীয় ছবির হুবহু মিল পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলায় মসজিদে যাওয়ার পথে হামলার শিকার হয়ে ৪৮ বছর বয়সী মুসলিম ব্যক্তি শরীফের মৃত্যু হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, হোলি উৎসবের সময় একদল লোক তার ওপর রং ছিটিয়ে দিলে তিনি প্রতিবাদ করেন। এরপরও তারা আবার রং ছিটায়, যা থেকে বাকবিতণ্ডা শুরু হয় এবং দ্রুত তা সহিংসতায় রূপ নেয়। তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। কয়েকজন পথচারী হস্তক্ষেপ করে তাকে একটি মাচায় বসতে সাহায্য করেন এবং পানি দেন। তবে কয়েক মিনিট পর তিনি হঠাৎ লুটিয়ে পড়েন এবং মারা যান।
এ বিষয়ে ভারতীয় আরেক সংবাদমাধ্যম ‘দ্যা কুইন্ট’ এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমে পুলিশ দাবি করেছিল শরীফ পড়ে গিয়ে মারা গেছেন। পরে তারা বক্তব্য পরিবর্তন করে জানায়, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে হার্ট অ্যাটাকের কথা বলা হয়েছে এবং তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে পরিবার এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে, এবং একজন স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনাও তাদের অভিযোগকে সমর্থন করে।
তবে কোথাও শরীফ বাংলাদেশি নাগরিক এরূপ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
পাশাপাশি, প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলেও আলোচিত দাবির সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে বাংলাদেশি সন্দেহে ভারতীয় নানা নাগরিককে হেনস্তা ও মারধর করার ঘটনা ঘটার বিষয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে নানা সংবাদ পাওয়া যায়। পাশাপাশি, গত ডিসেম্বরে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ সীমান্তের কাছে ভারতীয় ভূখণ্ডের ভেতরে খাসি জনগোষ্ঠীর লোকজনের গুলিতে মোহাম্মদ আশিকুর ও মোসাইদ আলী নামে দুই বাংলাদেশি যুবক নিহত হয়েছেন। কিন্তু, সাইদুর নামে আলোচিত দাবির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
সুতরাং, ভারতীয় ভিন্ন পুরোনো ঘটনার ছবি প্রচার করে ভারতে চিকিৎসার কাজে যাওয়া সাইদুর নামে বাংলাদেশি নাগরিককে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে বলে প্রচার করা হয়েছে: যা মিথ্যা।





