শনিবার, জানুয়ারি 17, 2026

ফিরে আসা গুজব: মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারের দলীয় পরিচয় দাবিতে ভুয়া তালিকা প্রচার

২০১৯ সাল থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে নানা প্লাটফর্মের আলোচনায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারের দলীয় পরিচয়ের পরিসংখ্যান সংক্রান্ত একটি দাবি প্রচার হয়ে আসছে। ডিজিটাল ব্যানারে প্রচারিত এই দাবিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর সে সময়ের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক রাজাকারের একটি তালিকা প্রকাশ করেন, যাতে দেখা যায় জামায়াতে ইসলামীর রাজাকার সংখ্যা ৩৭ জন। একইভাবে বিএনপির ১০২৪ জন, আওয়ামী লীগের ৮০৬০ জন এবং অন্যান্য দলের ৮৭৯ জন। এই সংখ্যাটা মোট ১০ হাজার জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে এই দাবির পোস্টগুলোতে।  

উক্ত দাবির চলতি বছরের ফেসবুক পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে

একই দাবির পোস্ট/ভিডিও দেখুন ইনস্টাগ্রাম, থ্রেডস, এক্স এবং ইউটিউবে। 

একই দাবিতে টিকটকের একটি ভিডিও দেখুন এখানে। ভিডিওতে বিচারকের পোশাকে থাকা এক ব্যক্তিকে একই দাবিতে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। গত জুনে প্রকাশিত ভিডিওটি দেখা হয়েছে প্রায় পৌনে চার লক্ষ বার। 

একই দাবি চলতি বছর বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের বক্তব্যেও এসেছে। এর মধ্যে রয়েছেন আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করীম, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান চৌধুরী। 

ফ্যাক্টচেক 

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধে রাজাকারের দলীয় পরিচয় দাবিতে প্রচারিত তালিকাটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, ২০১৯ সালে সরকার কর্তৃক প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় দলীয় পরিচয় নিয়ে কোনো পরিসংখ্যান উল্লেখ ছিল না। তালিকায় থাকা সকল ব্যক্তির নামের পাশেও দলীয় পরিচয় উল্লেখ পাওয়া যায়নি। 

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে এ সংক্রান্ত পোস্টগুলোতে ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর তালিকা প্রকাশের সূত্রে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে সে বছরের ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সেদিন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনা করে প্রথম ধাপে ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এই তালিকা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে (https://molwa.gov.bd/) পাওয়া যাবে। যাচাই-বাছাই করে ধাপে ধাপে আরও তালিকা প্রকাশ করা হবে। 

একই খবর পরদিন পত্রিকাটির প্রথম পাতায় ‘রাজাকারের তালিকা প্রকাশ, গবেষকদের নানা প্রশ্ন’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। 

 Screenshot: Prothom Alo E-paper

অনলাইন এবং প্রিন্ট সংস্করণের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে কোন দলের কতজন রাজাকার তালিকায় রয়েছে সে সম্পর্কে কোনো তথ্য উল্লেখ পাওয়া যায়নি। তবে তালিকাটি যে বিতর্কিত ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত সে সময়ের একটি প্রতিবেদন থেকে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নামও পাওয়া গেছে।  

এ নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা-সমালোচনার মুখে ১৮ ডিসেম্বর ওই তালিকা স্থগিত করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তালিকাটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকেও প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে তার আগেই আলোচিত দাবিটি প্রচার হতে শুরু হয়। ১৮ ডিসেম্বর দিনভর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট হতে দেখা যায়। 

Screenshot: Facebook 

অর্থাৎ, স্থগিত হওয়া তালিকার ওপর ভিত্তি করেই যে দাবিটি ছড়িয়েছিল তা নিশ্চিত। 

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকাটি ইন্টারনেট আর্কাইভ থেকে সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, সেখানে সবার নামের পাশে দলীয় পরিচয় উল্লেখ নেই। 

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে যে নির্বাচন হয়েছিল তার প্রেক্ষিতে বেশ কিছু শূণ্য আসনে উপ-নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ১৯৭১ সালে। এই নির্বাচনে মনোনয়ন প্রাপ্তদের একটি তালিকা সংযুক্ত রয়েছে রাজাকারদের আলোচিত তালিকায়। সেখানে অনেকের নামের পাশেই দলীয় পরিচয় (যে দলের হয়ে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল) উল্লেখ পাওয়া যায়। 

দলীয় পরিচয় জানতে রাজনৈতিক দলগুলোর (যাদের নাম তালিকায় উল্লেখ রয়েছে) নামের বিভিন্ন বানান ব্যবহার করে তালিকাটিতে খোঁজ করা হয়েছে। 

‘awami league’ লিখে সার্চ করলে পাঁচজনের নাম পাওয়া যায়। অথচ, বলা হচ্ছে যে তালিকায় ৮০৬০ জন আওয়ামী লীগের রয়েছেন। 

Screenshot : PDF 

তালিকায় ‘bnp’ ও ‘nationalist party’ লিখে সার্চ করে কোনো ফলাফলই পাওয়া যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় বিএনপির অস্তিত্ব ছিল না। বিএনপি প্রতিষ্ঠা হয়েছে স্বাধীনতার পরে, ১৯৭৮ সালে। তাই স্বাভাবিকভাবেই তালিকায় যারা আছেন তাদের দলীয় পরিচয় ‘বিএনপি’ হবে না৷ অর্থাৎ, বিএনপির যে ১০২৪ জন তালিকায় রয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে তাও সঠিক নয়। 

Screenshot : PDF

এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নামের বিভিন্ন বানান ব্যবহার করে তালিকাতে অন্তত ৭৭ জনের নামের দলীয় পরিচয়ে জামায়াতের নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। এদের মধ্যে Jamaat-E-Islam বানানে ১ জন, Jamat-E-Islam বানানে ১১ জন, Jamat-E-Islami বানানে ৮ জন, Jamat-E_Islam বানানে ২ জন, Jamat-i-Islam বানানে ১ জন, Jamati Islam বানানে ২ জন, jamate Islam বানানে ৪ জন, jamate-Islam বানানে ১ জন, Zamat Islam বানানে ১ জন, J.Islam বানানে ২ জন, JI বানানে ৩৯ জন, J.I বানানে ৩ জন এবং J.I. বানানে ২ জন রয়েছে। 

Screenshot : PDF

তালিকায় উল্লেখ থাকা জামায়াতের সকল নেতার নামের পাশেও দলীয় পরিচয় উল্লেখ নেই। আবার একই ব্যক্তির নাম একাধিক বার উল্লেখের নজিরও রয়েছে। যেমন, ২০১৪ সালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযমের নাম তালিকায় একাধিক বার থাকলেও তার নামের পাশে দলের পরিচয় উল্লেখ নেই। 

এই তিন দল ছাড়াও তালিকায় পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি, মুসলিম লীগ, পাকিস্তান পিপলস পার্টিসহ একাধিক দলের দলীয় পরিচয় উল্লেখ করে প্রার্থীদের নাম পাওয়া যায়। আছে স্বতন্ত্র পরিচয়েও প্রার্থীর নাম।

এদিকে, টিকটকে একই দাবিতে যে ভিডিওটি ছড়িয়েছে সেটি পর্যালোচনা করে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারে তৈরি বলে প্রতীয়মান হয়। 

Screenshot: Tiktok

ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি কিনা তা জানতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল ‘ডিপফেক-ও-মিটার’সহ একাধিক টুল ব্যবহার করে এটি এআই দিয়ে তৈরির কমপক্ষে ৯২ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত সম্ভাবনা আছে বলে জানা যাচ্ছে।

অর্থাৎ, সমস্ত তথ্য উপাত্ত পর্যালোচনা করে এটা নিশ্চিত যে, আলোচিত তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের সকলের দলীয় পরিচয় উল্লেখ নেই। কোন দলের কতজন রাজাকার ছিলেন তাও তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি এবং এই তালিকাতেও তার উল্লেখ নেই। তিনটি দলের সাথে মনগড়া সংখ্যা বসিয়ে বছরের পর বছর ধরে ভুয়া দাবিটি প্রচার হয়ে আসছে। 

সুতরাং, রাজাকারের তালিকায় দলীয় পরিচয়ের পরিসংখ্যান সংক্রান্ত যে দাবি প্রচার করা হয়েছে; তা মিথ্যা। 

তথ্যসূত্র 

  • MOLWA: PDF
  • Rumor Scanner’s analysis  

আরও পড়ুন

spot_img