গত ২৩ নভেম্বর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বিএনপির নেতা-কর্মীদের সঙ্গে জামায়াত নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ হয়েছে। জগন্নাথদীঘি ইউনিয়নের বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। এরই প্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জাতীয় ও স্থায়ীয় বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমের নাম ও লোগো ব্যবহার করে কুমিল্লা-১১ আসন তথা চৌদ্দগ্রামে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী মনোনীত প্রার্থী জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও জামায়াতকে জড়িয়ে আটটি ফটোকার্ড প্রচার হতে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার। যেসব গণমাধ্যমকে জড়িয়ে এসব ফটোকার্ড প্রচার করা হয়েছে সেগুলো হলো যমুনা টেলিভিশন, সময় টেলিভিশন, কালের কণ্ঠ, ইনকিলাব, কালবেলা, ডিআরবি নিউজ, কুমিল্লা জার্নাল এবং খবর চৌদ্দগ্রাম।

যমুনা টিভির নামে প্রচারিত ফটোকার্ডে দাবি করা হয়েছে, ‘চৌদ্দগ্রামে ডা: আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের নির্দেশে যুবদল কর্মীর বাড়ি ঘর ভাঙচুর।’
সময় টিভির নামে প্রচারিত ফটোকার্ডে বলা হয়েছে, ‘ডা: তাহেরের নির্দেশে বিএনপি কর্মীর বাড়ি ঘর ভাঙচুর চৌদ্দগ্রামে’
কালের কণ্ঠের নামে প্রচারিত ফটোকার্ডে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির আজ সন্ধ্যা ছয় ঘটিকার সময়,, গুণবতী ইউনিয়ন ১ নং ওয়ার্ড, কালিয়াতল বাজারে,, জামাত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা,, বিএনপির দলীয় অফিস ভাঙচুর করেছে।’
ইনকিলাবের নামে প্রচারিত ফটোকার্ডে বলা হয়েছে, ‘চৌদ্দগ্রাম উপজেলা গুণবতী ইউনিয়ন ১নং ওয়ার্ড কালিয়াতল বাজারে বিএনপির দলীয় অফিস জামায়াত শিবিরের ভাংচুর’
কালবেলার নামে প্রচারিত ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ‘চৌদ্দগ্রামে বিএনপির পার্টি অফিস ভাঙচুর ডা: তাহেরের নির্দেশে’
ডিআরবি নিউজের নামে প্রচারিত ফটোকার্ডে উল্লেখ করা হয়, ‘ডা: তাহেরের নির্দেশে বিএনপি কর্মীর বাড়ি ঘর ভাঙচুর চৌদ্দগ্রামে’
কুমিল্লা জার্নালের নামে প্রচারিত ফটোকার্ডে বলা হয়েছে, ‘চৌদ্দগ্রাম বিএনপির কর্মীর বাড়ি গর ভাঙচুর আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের নির্দেশে’
খবর চৌদ্দগ্রামের নামে প্রচারিত ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ‘চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় জামাতের নেতৃত্বে বিএনপির বিভিন্ন ইউনিয়নের দলীয় অফিস ভাঙচুর’
উল্লেখিত দাবিতে ফেসবুক প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, চৌদ্দগ্রামে গত ২৩ নভেম্বর সংঘর্ষের ঘটনায় যমুনা টেলিভিশন, সময় টেলিভিশন, কালের কণ্ঠ, ইনকিলাব, কালবেলা, ডিআরবি নিউজ, কুমিল্লা জার্নাল এবং খবর চৌদ্দগ্রাম এমন কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। প্রকৃতপক্ষে, গণমাধ্যমগুলোর ফটোকার্ড ডিজাইন প্রযুক্তির সহায়তায় নকল করে আলোচিত দাবি সংবলিত ফটোকার্ডগুলো তৈরি করা হয়েছে।
আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো পৃথকভাবে যাচাই করেছে রিউমর স্ক্যানার।
যমুনা টিভির ফটোকার্ড যাচাই
আলোচিত ফটোকার্ডে থাকা যমুনা টিভির লোগো ও প্রকাশের তারিখের (২৪ নভেম্বর) সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলে পর্যবেক্ষণ করে এমন কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এছাড়া ফটোকার্ডটির শিরোনামে ব্যবহৃত ফন্টের সাথে যমুনা টিভির প্রচলিত ফটোকার্ডের শিরোনামে ব্যবহৃত ফন্টের অমিল পরিলক্ষিত হয়।
সময় টিভির ফটোকার্ড যাচাই
আলোচিত ফটোকার্ডে থাকা সময় টিভির লোগো ও প্রকাশের তারিখের সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো পর্যালোচনা করে উক্ত শিরোনাম সংবলিত কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। সময় টিভির ওয়েবসাইট কিংবা ইউটিউব চ্যানেলেও আলোচিত দাবি সমর্থিত কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে এর শিরোনামে ব্যবহৃত ফন্টের সাথে সময় টিভির প্রচলিত ফটোকার্ডের শিরোনামে ব্যবহৃত ফন্টের অমিল পরিলক্ষিত হয়।
কালের কণ্ঠের ফটোকার্ড যাচাই
ফটোকার্ডটিতে থাকা কণ্ঠের লোগো ও প্রকাশের তারিখের সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ পর্যবেক্ষণ করে এরূপ কোনো ফটোকার্ডের সন্ধান মেলেনি। এমনকি কালের কণ্ঠের ওয়েবসাইট কিংবা ইউটিউব চ্যানেলেও আলোচিত দাবি সমর্থিত সংবাদ পাওয়া যায়নি।

ফটোকার্ড পর্যবেক্ষণ করে এর সাথে কালের কণ্ঠের প্রচলিত ফটোকার্ডের একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া যায়। যেমন- উক্ত ফটোকার্ডে শিরোনামে ব্যবহৃত ফন্টের সাথে কালের কণ্ঠের প্রচলিত ফটোকার্ডের ফন্টের মিল নেই। এছাড়া, আলোচিত ফটোকার্ডের শিরোনামে যতি চিহ্ন ‘কমা (,)’ এর ভুল ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় এবং শিরোনামের শেষে দাঁড়ি (।) দিতে দেখা যায় যা সাধারণত গণমাধ্যমের ফটোকার্ডে দেখা যায়না।
গত ২৫ নভেম্বর কালের কণ্ঠের ওয়েবসাইটে ‘চৌদ্দগ্রামে বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষ, দলীয় অফিসসহ বাড়িঘর ভাঙচুর’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৩ নভেম্বর
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে বিএনপির ইউনিয়ন অফিস ও একটি বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ইনকিলাবের ফটোকার্ড যাচাই
ফটোকার্ডটিতে থাকা ইনকিলাবের লোগোর সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেল পর্যবেক্ষণ করে আলোচিত দাবি সমর্থিত কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদের অস্তিত্ব মেলেনি।

ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে এর শিরোনামে ব্যবহৃত ফন্টের সাথে ইনকিলাবের প্রচলিত ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ফন্টের অমিল পরিলক্ষিত হয় এবং ফটোকার্ডটির শিরোনামের শেষে দাঁড়ি (।) ব্যবহার করা হয়েছে যা সাধারণত ইনকিলাবের ফটোকার্ডে ব্যবহৃত হয়না।
গত ২৪ নভেম্বর ইনকিলাবের ওয়েবসাইটে ‘চৌদ্দগ্রামে বিএনপি অফিস ও জামায়াতের পাঠাগার পাল্টাপাল্টি ভাংচুর, আহত ১০’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভাংচুরের ঘটনায় বিএনপি ও জামায়াত একে-অপরকে দোষারোপ করছে। সোমবার (২৪ নভেম্বর) বিকেলে ঘটনাস্থলে পুলিশ রয়েছে বলে জানান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ হিলাল উদ্দিন আহমেদ।
কালবেলার ফটোকার্ড যাচাই
ফটোকার্ডটিতে থাকা কালবেলার লোগো ও প্রকাশের তারিখের সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে প পর্যবেক্ষণ করে উক্ত তারিখে আলোচিত শিরোনাম সংবলিত কোনো ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া, কালবেলার ওয়েবসাইট এবং ইউটিউব চ্যানেলেও উক্ত দাবির বিষয়ে কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে এর শিরোনামে ব্যবহৃত ফন্টের সাথে কালবেলার প্রচলিত ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ফন্টের অমিল পরিলক্ষিত হয়। এছাড়া আলোচিত ফটোকার্ডে ব্যবহৃত কালারের সাথেও কালবেলার প্রচলিত ফটোকার্ডের কালারের মিল নেই।
ডিআরবি নিউজের ফটোকার্ড যাচাই
রংপুর বিভাগের গণমাধ্যম ডিআরবি নিউজের লোগোর সূত্র ধরে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং ইউটিউব চ্যানেল পর্যবেক্ষণ করে আলোচিত দাবি সমর্থিত কোনো সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে এর শিরোনামে ব্যবহৃত ফন্টের সাথে ডিআরবি নিউজের প্রচলিত ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ফন্টের অমিল পরিলক্ষিত হয়।
কুমিল্লা জার্নালের ফটোকার্ড যাচাই
কুমিল্লার স্থানীয় দৈনিক কুমিল্লা জার্নালের সূত্র ধরে
গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট এবং ইউটিউব চ্যানেল পর্যবেক্ষণ করে আলোচিত দাবি সমর্থিত কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে এর শিরোনামে ব্যবহৃত ফন্টের সাথে কুমিল্লা জার্নালের প্রচলিত ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ফন্টের অমিল পরিলক্ষিত হয়।
গত ২৫ নভেম্বর গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে প্রকাশিত পোস্টে এক বিবৃতির মাধ্যমে আলোচিত ফটোকার্ডটি ভুয়া বলে জানানো হয়।
খবর চৌদ্দগ্রামের ফটোকার্ড যাচাই
চৌদ্দগ্রামের স্থানীয় সংবাদ ভিত্তিক ফেসবুক পেজ ‘খবর চৌদ্দগ্রাম’ পর্যবেক্ষণ করে আলোচিত ফটোকার্ডটির সন্ধান মেলেনি।

ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে এর শিরোনামে ব্যবহৃত ফন্টের সাথে খবর চৌদ্দগ্রামের প্রচলিত ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ফন্টের অমিল পরিলক্ষিত হয়।
গত ২৪ নভেম্বর উক্ত ফেসবুক পেজে ‘চৌদ্দগ্রামে বাকবিতন্ডার জেরে বিএনপি অফিস ও জামায়াতের পাঠাগার ভাংচুর, আহত ১০’ শীর্ষক ক্যাপশনে প্রকাশিত একটি পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়।
পোস্টের মন্তব্যঘরে পেজটির পক্ষ থেকে বলা হয়,
‘কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাক বিতন্ডার জের ধরে জগন্নাথদীঘির পাড়ে শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ কার্যালয় ও কালিকাপুর ইউনিয়নের রাজার বাজার ইসলামী পাঠাগার ভাংচুর করা হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে উভয়পক্ষের ১০ জন। ভাংচুরের ঘটনায় বিএনপি ও জামায়াত একে-অপরকে দোষারোপ করছে। সোমবার (২৪ নভেম্বর) বিকেলে ঘটনাস্থলে পুলিশ রয়েছে বলে জানান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ হিলাল উদ্দিন আহমেদ।’
সুতরাং, চৌদ্দগ্রামে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ঘটনায় জামায়াতকে জড়িয়ে যমুনা টেলিভিশন, সময় টেলিভিশন, কালের কণ্ঠ, ইনকিলাব, কালবেলা, ডিআরবি নিউজ, কুমিল্লা জার্নাল এবং খবর চৌদ্দগ্রাম এর নামে প্রচারিত উল্লেখিত ফটোকার্ডগুলো ভুয়া ও বানোয়াট।
তথ্যসূত্র
- Prothom Alo: চৌদ্দগ্রামে বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষে আহত ৭, দলীয় কার্যালয় ও বাড়ি ভাঙচুর
- Kaler Kantho: চৌদ্দগ্রামে বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষ, দলীয় অফিসসহ বাড়িঘর ভাঙচুর
- Inqilab: চৌদ্দগ্রামে বিএনপি অফিস ও জামায়াতের পাঠাগার পাল্টাপাল্টি ভাংচুর, আহত ১০
- Comillar Journal: Facebook Post





