সম্প্রতি অনলাইনে কথিত একটি জরিপের ছবি প্রচার করে দাবি করা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক আন্তর্জাতিক নির্বাচনী জরিপ প্রতিষ্ঠান International Elections Survey Center ছয় মাস যাবত বাংলাদেশ নিয়ে জরিপ পরিচালনা করছেন। প্রতিষ্ঠানটি ৩১৩৩৮ জরিপ পরিচালনা কর্মী দিয়ে সরাসরি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। জরিপে এই পর্যন্ত বাংলাদেশের ২৭৩২১০৬ জন অংশগ্রহণ করেন। উক্ত জরিপে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা কার বেশি এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনার নাম বলেন ৫৯.৮২ শতাংশ, বিএনপির তারেক রহমানের নাম বলেন ২৪.৩৮ শতাংশ, জাতীয় পার্টির জিএম কাদেরের নাম বলেন ১০.১১ শতাংশ, জামায়াতের শফিকুর রহমানের নাম বলেন ৫.৬৭ শতাংশ, এনসিপির নাহিদ ইসলামের নাম বলেন ০.০২ শতাংশ।’

এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
এরূপ দাবিতে ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
এরূপ দাবিতে টিকটকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
এরূপ দাবিতে এক্সে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘International Elections Survey Center’ নামে এমন কোনো জরিপ প্রতিষ্ঠান নেই যারা সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত দাবির অনুরূপ কোনো জরিপ প্রকাশ করেছে। তাছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নির্বাচনের সরকার গঠন নিয়ে প্রকাশিত নানা জরিপে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নয় বরং, বিএনপির পক্ষে তুলনামূলক সবচেয়ে বেশি মানুষের মতামত দেখা যায়।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলে ‘International Elections Survey Center’ নামে এমন কোনো জরিপ প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া যায়নি যারা সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত দাবির অনুরূপ কোনো জরিপ প্রকাশ করেছে। তাছাড়া, আলোচিত দাবিতে উল্লিখিত ৩১৩৩৮ জরিপ পরিচালনা কর্মী দিয়ে সরাসরি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলাদেশের ২৭৩২১০৬ জন মানুষের অংশগ্রহণে এরূপ কোনো বৃহৎ আকারের জরিপ আসলেই হয়ে থাকলে তা মূলধারার গণমাধ্যমে প্রচার হতো। কিন্তু আলোচিত দাবির সপক্ষে মূলধারার গণমাধ্যম সূত্রে কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রকৃতপক্ষে উক্ত নামে কোনো আন্তর্জাতিক স্বনামধন্য জরিপ সংস্থারই খোঁজ পাওয়া যায়নি। উক্ত নামের কাছাকাছি International Survey Center নামের একটি প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পাওয়া যায়, কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে এ ধরণের কোনো জরিপ করার তথ্য পাওয়া যায়নি।
এছাড়া, বাংলাদেশের নির্বাচনের বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক সংস্থার জরিপের বিষয়ে অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)’ এর ওয়েবসাইটে গত ১ ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি জরিপ পাওয়া যায়। জরিপটি আইআরআই (IRI)-এর ‘সেন্টার ফর ইনসাইটস ইন সার্ভে রিসার্চ’-এর পক্ষ থেকে একটি স্থানীয় গবেষণা সংস্থা ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবরের মধ্যে পরিচালনা করেছে। মাল্টি-স্টেজ স্ট্র্যাটিফাইড প্রোবাবিলিটি স্যাম্পলিং পদ্ধতি ব্যবহার করে সরাসরি ঘরে গিয়ে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। জরিপটিতে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ৪,৯৮৫ জন অংশগ্রহণকারীর তথ্য নেওয়া হয়েছে, যা জাতীয়ভাবে ভোট দেওয়ার বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিনিধিত্ব করে। জরিপে ভোটের অংশে বলা হয়, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশ জানিয়েছেন যে তারা ভোট দেওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী এবং ২৩ শতাংশ কিছুটা আগ্রহী। এছাড়া, ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা আশাবাদী যে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে।

এছাড়াও আইআরআই এর জরিপটিতে “জাতীয় নির্বাচনের কথা চিন্তা করলে, আগামী সপ্তাহে যদি সংসদীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে আপনি কোন দলকে ভোট দেবেন?’ এমন প্রশ্নের জবাবে ৩০ শতাংশ বিএনপি, ২৬ শতাংশ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ৬ শতাংশ জাতীয় নাগরিক পার্টি, ৫ শতাংশ জাতীয় পার্টি, ৩ শতাংশ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং ৮ শতাংশ এর বাইরে অন্য কোনো দলের নাম বলেন। একইরকম তথ্য আগামী সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকা ৩২৭০ জন ভোটারের উত্তরেও দেখা যায়। এছাড়াও, জরিপে ৬৯ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানান।
জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো’র ওয়েবসাইটে গত ২৪ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের সূত্রে ‘জনগণের নির্বাচন–ভাবনা’ শীর্ষক একটি জরিপের বিষয়ে জানা যায়। জরিপটি পরিচালনা করেছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন কনসাল্টিং। সহযোগিতা করেছে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ভয়েস ফর রিফর্ম ও বিআরএআইএন। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ২ তারিখ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশের ১০ হাজার ৪১৩ জন বিভিন্ন বয়সী ভোটারের ওপর জরিপটি চালানো হয়। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৪ হাজার ৭২১ জন উত্তরদাতা ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের পছন্দের দলের কথা প্রকাশ করেছেন। এতে দেখা গেছে, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ৪১ দশমিক ৩০ শতাংশ উত্তরদাতার পছন্দের দল বিএনপি। জামায়াতে ইসলামীকে পছন্দ করেছেন ৩০ দশমিক ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা। আর জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) পছন্দ করেছেন ৪ দশমিক ১০ শতাংশ উত্তরদাতা। নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ উত্তরদাতার পছন্দ কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া দল আওয়ামী লীগ। চলতি বছরের মার্চের চেয়ে সেপ্টেম্বর মাসে আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট দিতে চাওয়া ব্যক্তিদের হার বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ।
তাছাড়া, প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে গত ৯ ডিসেম্বরে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনের সূত্রে ‘গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে জাতীয় জনমত জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক শিরোনামে প্রথম আলো’র উদ্যোগে করা এক জরিপের বিষয়েও তথ্য পাওয়া যায়। জরিপে একটি প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশের বিভিন্ন নেতার মধ্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা কার বেশি বলে মনে করেন? এ প্রশ্নের জবাবে সবচেয়ে বেশি সাড়ে ৪৭ শতাংশ মানুষ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে মত দিয়েছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা, এমন মত প্রায় ১৯ শতাংশ মানুষের। অন্যদিকে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা মনে করেন ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ। জরিপে ৭ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ বলেছেন, শেখ হাসিনার পরবর্তী নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে (উল্লেখ্য, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনার সাজা হওয়ার আগে জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে)। এর বাইরে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং শূন্য দশমিক ২ শতাংশ মানুষ জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা দেখেন।
অনুসন্ধানে কোথাও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনায় আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনার পক্ষে ৫৯.৮২ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন এরূপ দাবির সপক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য জরিপ প্রতিষ্ঠানের করা জরিপের সন্ধান পাওয়া যায়নি। বরং, সাম্প্রতিক সময়ের নানা জরিপে শীর্ষে বিএনপিকে এবং এরপরের অবস্থানে জামায়াতে ইসলামীকে দেখা যায়।
সুতরাং, যুক্তরাজ্য ভিত্তিক একটি জরিপ প্রতিষ্ঠানের জরিপে বাংলাদেশের আগামী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনায় আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনার পক্ষে ৫৯.৮২ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন শীর্ষক দাবিটি ভুয়া।
তথ্যসূত্র
- International Republican Institute – IRI Survey Shows Bangladeshis Overwhelmingly Approve of Yunus and Interim Government’s Job Performance
- Prothom Alo – ‘জনগণের নির্বাচন–ভাবনা’ জরিপ: কোন দলের প্রতি কত সমর্থন
- Prothom Alo – তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন ৪৭%
- Rumor Scanner’s analysis





