বুধবার, ডিসেম্বর 17, 2025

আ.লীগের লকডাউনে সেনাবাহিনী কার্যকর ভূমিকা পালন করবে না দাবিতে সেনা কর্মকর্তাদের নামে ভুয়া তথ্য প্রচার

আজ ১৩ নভেম্বর দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পূর্ব ঘোষিত ঢাকা লকডাউন কর্মসূচির প্রেক্ষিতে অবরোধ পালিত হচ্ছে। উক্ত কর্মসূচিকে ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে গত কয়েকদিন যাবৎ সেনাপ্রধানসহ বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার বক্তব্য প্রদানের ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগের লকডাউন কর্মসূচিতে সেনাবাহিনী কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করবে না। এছাড়াও পোস্টগুলোতে দাবি করা হয় সেনাবাহিনীর উক্ত কর্মকর্তারা ‘১৩ তারিখ লকডাউন ঘিরে সেনাবাহিনী কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে। এমনিতেই সেনাবাহিনী বিভিন্ন দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে আছে, আপনারা নির্ভয়ে প্রস্তুতি গ্রহন করুন।’ শীর্ষক মন্তব্য করেছেন।

এমন দাবির সঙ্গে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানকে জড়িয়ে প্রচারিত পোস্ট দেখুন:  এখানে (আর্কাইভ)।

একই দাবিতে সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামানকে জড়িয়ে প্রচারিত দাবি দেখুন: এখানে (আর্কাইভ)। 

সেনাসদরের কর্নেল স্টাফ কর্নেল মো. শফিকুল ইসলামকে জড়িয়ে দাবি দেখুন: এখানে (আর্কাইভ)।

লে. কর্নেল লুৎফর রহমানকে জড়িয়ে প্রচারিত দাবি দেখুন: এখানে (আর্কাইভ)।

ইনস্টাগ্রামে পোস্ট দেখুন এখানে

ইউটিউবে পোস্ট দেখুন এখানে

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের লকডাউন কর্মসূচিতে সেনাবাহিনী কার্যকর ভূমিকা পালন করবেনা দাবিতে প্রচারিত তথ্যটি সম্পূর্ণ ভুয়া। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বা অন্য কোনো সেনা কর্মকর্তা এ ধরনের কোনো মন্তব্য করেননি। প্রকৃতপক্ষে, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানসহ একাধিক সেনা কর্মকর্তার ভিন্ন সময়ে দেওয়া অসংশ্লিষ্ট বক্তব্যের ভিডিও ফুটেজ জুড়ে ভিত্তিহীনভাবে এই দাবি প্রচার করা হয়েছে।

ভিডিও যাচাই ১

Screenshot: Facebook

আলোচিত দাবিতে প্রচারিত সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধানের শুরুতে ভিডিওটি পর্যালোচনা করে দেখে রিউমর স্ক্যানার। পর্যালোচনায় ভিডিওটিতে সেনাপ্রধানকে ‘অবশ্যই আমরা চাইবো না যে এক্সট্রা জুডিশিয়াল কোনো অ্যাকশন তাদের উপর হোক। বিচার বহির্ভূত কোনো কাজ হোক। তাদের উপরে হামলা হোক বা তাদের জীবনে যে হুমকি যেটা আছে, সেটা আমার না।’ শীর্ষক কথাগুলো বলতে শোনা যায়। এই বক্তব্যের সঙ্গে ১৩ নভেম্বরের লকডাউন কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক থাকার কথা না।

পরবর্তীতে আলোচিত ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধানে রিভার্স ইমেস সার্চের মাধ্যমে মূলধারার গণমাধ্যম দ্য বিজনেস স্ট্যার্ডাড-এর ফেসবুক পেজে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট প্রচারিত মূল ভিডিওটি খুঁজে পাওয়া যায়। 

Video Comparison by Rumor Scanner 

ভিডিওটির শিরোনাম থেকে জানা যায়, এটি ২০২৪ সালের আগস্টে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাজশাহীতে অবস্থানকালে করা একটি সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও। এছাড়াও লক্ষ্য করা যায়, সংবাদ সম্মেলনে তিনি ৫ আগস্টের পর সংখ্যালঘুদের ওপর হওয়া হামলার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আলোচিত মন্তব্যটি করেন। অর্থাৎ, আলোচিত ভিডিওটির সাথে আওয়ামী লীগের আজকের ঢাকা লকডাউন কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক নেই।

ভিডিও যাচাই ২

Screenshot: Facebook

সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামানকে জড়িয়ে প্রচারিত ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধানে রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে গত ১১ অক্টোবর নিউজ-২৪ এর ইউটিউব চ্যানেলে মূল ভিডিওটি খুঁজে পাওয়া যায়। 

Video Comparison by Rumor Scanner 

ভিডিওটিতে মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামানকে ‘বাংলাদেশ আর্মি একদম স্পষ্ট ভাষায় বলে দিচ্ছি, বাংলাদেশ আর্মি জাস্টিসের পক্ষে। যেটা জাস্টিস হবে সেটার পক্ষে আমরা থাকবো। ইনসাফ, নো কমপ্রমাইজ উইথ ইনসাফ। কাম হোয়াটস মেবি জাস্টিসের পক্ষে আমরা অবশ্যই অবশ্যই স্ট্যান্ডফাস্ট এবং দৃঢ়।’ শীর্ষক কথাগুলো বলতে শোনা যায়। এর সাথেও আওয়ামী লীগের উল্লিখিত কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়না। 

প্রাপ্ত ভিডিওটিতেও মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান কোন প্রেক্ষিতে এমন মন্তব্য করেছেন সেটি জানতে পরবর্তীতে কি-ওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে রিউমর স্ক্যানার। অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যম কালের কণ্ঠের ওয়েবসাইটে ১১ অক্টোবর বাংলাদেশ আর্মি বিচারের পক্ষে : সেনাসদর শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়, গত ১১ অক্টোবর ঢাকা সেনানিবাসের অফিসার্স মেসে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান গুম কমিশনকে প্রয়োজনী নথীপত্র দিয়ে আর্মির সহযোগিতা করার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আলোচিত মন্তব্যটি করেন। 

এছাড়াও আওয়ামী লীগের ঢাকা লকডাউন কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয় গত ২ নভেম্বর। অর্থাৎ, মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামানের আলোচিত ভিডিওটির সাথে আওয়ামী লীগের উল্লিখিত কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক নেই।

ভিডিও যাচাই ৩

Screenshot: Facebook

সেনাসদরের কর্নেল স্টাফ কর্নেল মো. শফিকুল ইসলামকে জড়িয়ে প্রচারিত ভিডিওটিতেও তাকে আলোচিত দাবির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কথা বলতে শোনা যায়নি। ভিডিওটিতে তাকে ‘আমরা এই বিষয়গুলো নিয়ে কোনো মুখোমুখি কোনো অবস্থান দেখছি না। আমাদের মধ্যে যথেষ্ট সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ রয়েছে এবং আমরা একত্রে একসাথে দেশের জন্য, দেশের স্বার্থে, জনগণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত কোনো কাজে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্পৃক্ত হবে না।’ শীর্ষক কথাগুলো বলতে শোনা যায়।

তার ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রেস বিফ্রিংয়ের একই ভিডিওটি পাওয়া না গেলেও ভিন্ন কোণ থেকে ধারণ করা সেদিনের ব্রিফিংয়ের সম্পূর্ণ আরেকটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। 

Video Comparison by Rumor Scanner 

ভিডিওটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এর ১০ মিনিট থেকে ১০ মিনিট ৬ সেকেন্ড এবং ১৩ মিনিট ৫৫ সেকেন্ড থেকে ১৪ মিনিট ১০ সেকেন্ডের মধ্যে কর্নেল মো. শফিকুল ইসলামের দেওয়া বক্তব্যের সাথে আলোচিত ভিডিওর বক্তব্যের মিল রয়েছে। এসময় তাকে আলোচিত মানবিক করিডর ও সরকারের সাথে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক ইস্যুতে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে দেখা যায়। যার সাথে আলোচিত দাবির কোনো সম্পর্ক নেই। 

ভিডিও যাচাই ৪

Screenshot: Facebook 

সর্বশেষ একই দাবিতে প্রচারিত আরেক সেনা কর্মকর্তার ভিডিওটি পর্যালোচনা করে দেখে রিউমর স্ক্যানার। উক্ত ভিডিওতে তাকে ‘সেনাবাহিনী কোন ব্যক্তি বা দলের পক্ষে নয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিপক্ষে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের পক্ষে।’ শীর্ষক কথাগুলো বলতে শোনা যায়। যা আলোচিত দাবির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক নয়। 

পরবর্তীতে ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যম সমকালের ফেসবুক পেজে গত ৭ নভেম্বর প্রচারিত মূল ভিডিওটি খুঁজে পাওয়া যায়। 

Video Comparison by Rumor Scanner 

প্রাপ্ত ভিডিওটির ১ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে তাকে আলোচিত মন্তব্যটি করতে শোনা যায়। জানা যায়, ভিডিওটি গাজীপুরের শ্রীপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে অস্ত্রসহ সাতজন আটক হওয়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রতিবাদ জানিয়ে সেনাবাহিনীর সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও এটি। উক্ত সংবাদ সম্মেলনে ১৪ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারির অধিনায়ক লে. কর্নেল লুৎফর রহমানকে কথা বলছেন বলেও জানা যায়। তবে সংবাদ সম্মেলনর কোথাও লে. কর্নেল লুৎফর রহমানকে আলোচিত দাবির পক্ষে কোনো কথা বলে শোনা যায়নি।

অর্থাৎ, আওয়ামী লীগের লকডাউন কর্মসূচিতে সেনাবাহিনী কার্যকর ভূমিকা পালন করবেনা দাবিতে ভিত্তিহীনভাবে সেনাবাহিনীর ভিন্ন ভিন্ন কয়েকটি অপ্রাসঙ্গিক সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।

সুতরাং, ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ইস্যুতে দেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের একাধিক বক্তব্যের ভিডিও ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের লকডাউন কর্মসূচিতে সেনাবাহিনী কার্যকর ভূমিকা পালন করবে না দাবিতে প্রচার করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

আরও পড়ুন

spot_img