জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গত ১৭ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর প্রেক্ষিতে সম্প্রতি, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করার জন্যে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে একটি নির্দেশনামূলক চিঠি দিয়েছেন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসুবকে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।

ফেসবুকে প্রচারিত এমন ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
টিকটকে প্রচারিত একই ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
একই দাবিতে থ্রেডসে প্রচারিত ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
ইউটিউবে প্রচারিত ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করার জন্যে জাতিসংঘের মহাসচিবের বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে নির্দেশনামূলক চিঠি দেওয়ার দাবিতে প্রচারিত তথ্যটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, যমুনা টেলিভিশনের ভিন্ন একটি প্রতিবেদনের সংবাদপাঠিকার ফুটেজকে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনা করে তার ভয়েস পরিবর্তন করে সেটির সাথে জাতিসংঘের মহাসচিবের গাজা ইস্যুতে দেওয়া একটা বক্তব্যের ভিডিও এবং কয়েকটি অপ্রাসঙ্গিক ভিডিও যুক্ত করে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানের শুরুতে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি পর্যালোচনা করে দেখে রিউমর স্ক্যানার টিম। পর্যালোচনায় ভিডিওটির শুরুতে একটি গণমাধ্যমের সংবাদপাঠিকার ফুটেজ দেখতে পাওয়া যায়। উক্ত ফুটেজে সংবাদপাঠিকাকে ‘শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করার জন্য রাষ্ট্রপতিকে হুশিয়ারিমূলক চিঠি দিল জাতিসংঘ’ শীর্ষক কথাগুলো বলতে শোনা যায়। পরবর্তীতে জাতিসংঘর মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্য প্রদানের একটি ফুটেজও দেখতে পাওয়া যায়। যেটিতে দেশীয় ইংরেজি সংবাদসংস্থা ইউএনবি-এর লোগো লক্ষ্য করা যায়। পরবর্তীতে বেশকিছু অপ্রাসঙ্গিক ভিডিওর সাথে আলোচিত দাবির চিঠির ছবি দাবিতে কয়েকটি ফুটেজও ভিডিওটিতে দেখানো হয়।
আলোচিত দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে উক্ত দাবিতে প্রচারিত এই ভিডিওটিতে থাকা প্রাসঙ্গিক ভিডিওগুলোর বিষয়ে পৃথক পৃথকভাবে অনুসন্ধান করে রিউমর স্ক্যানার।
ভিডিও যাচাই ১
আলোচিত দাবিটির বিষয়ে অনুসন্ধানের শুরুতে ভিডিওর প্রথমাংশে দেখতে পাওয়া সংবাদপাঠিকার ফুটেজটি পর্যালোচনা করে এতে ‘শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু’ শীর্ষক লেখা দেখতে পাওয়া যায়।

পরবর্তীতে উক্ত শিরোনাম ও সংবাদপাঠিকার পরিহিত পোশাকের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে যমুনা টেলিভিশনের ইউটিউব চ্যানেলে গত ১৮ নভেম্বর প্রচারিত বিকেল ৪টার সংবাদ বুলেটিনের ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত সংবাদ বুলেটিনের দ্বিতীয় সংবাদে আলোচিত ওই সংবাদপাঠিকাকে ‘শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু’ শীর্ষক সংবাদটি পাঠ করতে দেখা যায়। যেটি ভিডিওটির ১ মিনিট ২৫ সেকেন্ড থেকে শুরু হয়। তবে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটিতে সংবাদপাঠিকাকে ‘শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করার জন্য রাষ্ট্রপতিকে হুশিয়ারিমূলক চিঠি দিল জাতিসংঘ’ শীর্ষক কথাগুলো বলতে শোনা গেলেও মূল প্রতিবেদনে সংবাদপাঠিকাকে ‘ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে শেখ হাসিনাকে ফেরত আনা কঠিন হবে। প্রত্যর্পণ চুক্তি দিল্লির বর্তমান বাস্তবতায় অপ্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেন বিশ্লেষকরা। একমাত্র ভারতের জনগণ তাদের সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য করতে পারে। বিশ্লেষকদের মত, দীর্ঘমেয়াদে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বার্থ বিবেচনায় বর্তমান অবস্থান থেকে এখনই সরে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে ভারতের সামনে।’ শীর্ষক কথাগুলো বলতে শোনা যায়।
এছাড়াও উক্ত প্রতিবেদনের সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওর পরবর্তী অংশেরও কোনো মিল নেই। এ থেকে স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় উক্ত প্রতিবেদনের সংবাদপাঠিকার কণ্ঠ পরিবর্তন করে আলোচিত ভয়েসটি যুক্ত করা হয়েছে।
ভিডিও যাচাই ২
আলোচিত ভিডিওতে দেখতে পাওয়া জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের ফুটেজটির বিষয়ে জানতে ভিডিওতে দৃশ্যমান দেশীয় সংবাদসংস্থা ইউএনবি-র লোগোর সূত্র ধরে অনুসন্ধান করে ইউএনবির ইউটিউব চ্যানেলে গত ২৯ জুলাই প্রচারিত মূল ভিডিওটি খুঁজে পাওয়া যায়।

ভিডিওটির শিরোনাম ও বিস্তারিত বিবরণী থেকে জানা যায়, জাতিসংঘের মহাসচিব নিউইয়র্কে এক উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনে গাজা ইস্যুতে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলকে যুদ্ধ বন্ধে কার্যকর সমাধানের আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। উক্ত ভিডিওতে তাকে সেই ইস্যুতেই বক্তব্য প্রদান করতে দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, জাতিসংঘের মহাসচিবের বক্তব্য প্রদানের উক্ত ভিডিওটির সাথে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কোনো সম্পর্ক নেই। এছাড়াও উক্ত ভিডিও এবং শেখ হাসিনার রায়ের মধ্যে সময়ের বেশ পার্থক্য রয়েছে।
ভিডিও যাচাই ৩
পরবর্তীতে আলোচিত ভিডিওটিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে জাতিসংঘের মহাসচিবের পাঠানো চিঠির ফুটেজ দাবিতে কয়েকটি ফুটেজ দেখানো হয়। চিঠিটির বিষয়ে অনুসন্ধানে ভিডিওতে দেখতে পাওয়া চিঠিটিকে সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করে রিউমর স্ক্যানার। পর্যালোচনায় আলোচিত চিঠিতে জাতিসংঘের লোগো ও নাম উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশের নাম Bangladon লেখা রয়েছে বলে দেখা যায়, এছাড়াও চিঠির বডিতে থাকা বাকি লেখাগুলোতে অস্পষ্টতা লক্ষ্য করা যায়। যা সাধারণত এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো লেখা সম্বলিত ছবি বা ভিডিও তৈরি করলে তাতে দেখা যায়।

এছাড়াও অনুসন্ধানে গণমাধ্যম কিংবা অন্যকোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডাদেশের প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের মহাসচিবের বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে কোনো চিঠি পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) সব পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে সংস্থার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বলে জানা যায়।
অর্থাৎ, এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে, আলোচিত চিঠির ফুটেজ দাবিতে তৈরি ভিডিওটি এআই প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি করা হয়েছে।
সুতরাং, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করার জন্যে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে নির্দেশনামূলক চিঠি দিয়েছেন শীর্ষক দাবিটি মিথ্যা।
তথ্যসূত্র
- Jamuna TV Youtube Channel: News Headline and Bulletin | Jamuna News | 4 PM | 18 November 2025
- UNB – United News of Bangladesh Youtube Channel: জাতিসংঘ মহাসচিব: গাজায় যুদ্ধের অবসান ও দুই রাষ্ট্র সমাধান নিশ্চিত করুন | UN Conference | UNB
- Rumor Scanner’s Analysis





