গত নভেম্বর থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য দাবিতে একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। ভিডিওতে ট্রাম্পের কণ্ঠে শোনা যায়, “আমি বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানি, ড. ইউনূস অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরিকল্পনা করে মানুষ হত্যা করেছেন এবং তার দোষ আওয়ামী লীগের ওপর চাপিয়েছেন। ড. ইউনূসের সূক্ষ্ম পরিকল্পনায় বাংলাদেশের তিন হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।”
উক্ত দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
একই দাবিতে ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

এই ভিডিওটি ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের পরও একই দাবিতে পুনরায় প্রচারিত হয়েছে।

উক্ত দাবিতে টিকটকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)৷
এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া অবধি টিকটকে প্রচারিত সর্বাধিক ভাইরাল ভিডিওটি প্রায় ২৬ হাজার বার দেখা হয়েছে, এটিতে প্রায় ১ হাজার পৃথক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে এবং ভিডিওটি প্রায় ৩ শত বার শেয়ার করা হয়েছে।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসকে জড়িয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রচারিত ভিডিওর মন্তব্যটি দেননি। প্রকৃতপক্ষে, ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উক্ত ভুয়া ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে Sky News Australia এর ওয়েবসাইটে গত ০৬ নভেম্বর ‘Trump hits out against ‘communist’ Mamdani as crowd boos following NYC election’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। উক্ত ভিডিওর সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটির দৃশ্যের মিল রয়েছে।

উক্ত ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এটির ০০:০৩ থেকে ০০:১০ সেকেন্ড অংশে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আংশিক অঙ্গভঙ্গি ও পোশাক, তার পেছনে থাকা উভয় পতাকার অবস্থান, পশ্চাৎপট এবং অন্যান্য বিষয়বস্তুর সাথে আলোচিত ভিডিওটির মিল রয়েছে। তবে আলোচিত ভিডিওতে ট্রাম্পকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জড়িয়ে কোনো মন্তব্য দিতে দেখা বা শোনা যায়নি।
উক্ত ভিডিওটির বিবরণী থেকে জানা যায়, এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকান বিজনেস ফোরামে ভাষণ দেন এবং সে সময়ে নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে নির্বাচিত জোহরান মামদানির সমালোচনা করেন।
পরবর্তীতে, The Economic Times এর ওয়েবসাইটে গত ০৬ নভেম্বর ‘Whatever the hell his name is: Trump mocks NYC Mayor-elect Mamdani’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ৫ নভেম্বর মায়ামির কাসেয়া সেন্টারে আমেরিকান বিজনেস ফোরামে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বক্তৃতা দেন। উক্ত মন্তব্যে তিনি সে সময়ে সদ্য সমাপ্ত নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে নির্বাচিত জোহরান মামদানির সমালোচনা করেন এবং এ সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিষয়াবলী নিয়ে কথা বলেন। তার উক্ত মন্তব্যে ড. ইউনূস কিংবা শেখ হাসিনার প্রসঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, উক্ত ভিডিওর ঘটনাটি গত ০৫ নভেম্বরের যা ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনার মামলার রায় ঘোষণার পূর্বে ঘটেছে।
এ বিষয়ে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভিডিওটিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাচনভঙ্গিতে কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। এছাড়া ১৪ সেকেন্ডের আলোচিত ভিডিওর ৭ সেকেন্ডে একটি কাট রয়েছে। বর্তমানে ব্যবহৃত সাধারণ এআই টুলগুলো দীর্ঘ সময়ের নিরবচ্ছিন্ন ভিডিও তৈরি করতে সক্ষম নয়, তাই ছোট ছোট ক্লিপ জোড়া দিয়ে বড় ভিডিও তৈরি করা হয়। আলোচিত ভিডিওটিও এই পদ্ধতিতে তৈরি বলে প্রতীয়মান হয়।
উক্ত ভিডিওটির বিষয়ে অধিকতর নিশ্চিত হতে এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম ‘DeepFake-O-Meter’ এর ‘AVSRDD (2025)’ মডেলের মাধ্যমে ভিডিওটি পরীক্ষা দেখা যায়, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯.৯ শতাংশ।

এআই অডিও কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম Resemble AI এ ভিডিওটির অডিও যাচাই করা হলে সেটিকে ‘Fake’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সুতরাং, এআই দিয়ে তৈরি একটি ভিডিওকে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের ভূমিকার সমালোচনা করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য দাবিতে প্রচার করা হয়েছে; যা মিথ্যা।
তথ্যসূত্র
- Sky News Australia – Trump hits out against ‘communist’ Mamdani as crowd boos following NYC election
- The Economic Times – Whatever the hell his name is: Trump mocks NYC Mayor-elect Mamdani
- DeepFake-O-Meter – Website
- Resemble AI – Website





