শনিবার, ফেব্রুয়ারি 7, 2026

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে বিএনপির দুই নেতার বক্তব্য কাটছাঁট করে অপপ্রচার

নির্বাচনকালীন সময়ের বক্তব্য দাবিতে বিএনপির দুই নেতাকে উদ্ধৃত করে পৃথক দুইটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিও দুইটিতে থাকা বক্তব্যগুলো সংশ্লিষ্ট নেতাদের নিজস্ব বক্তব্য দাবি করে প্রচার করা হচ্ছে।

কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলা বিএনপি নেতা মিয়া মোহাম্মদ ইদ্রিসকে উদ্ধৃত করে ছড়ানো এক ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘রোজা, নামাজ, হজ, যাকাত কিছু লাগবে না। ধানের শীষে ভোট দিলেই বেহেশতে যেতে পারবেন।’

গণমাধ্যমে প্রচারিত এমন দাবি দেখুন: গণকণ্ঠ, সোনালী নিউজ

এই দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত কিছু পোস্ট দেখুন: এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে

একই দাবিতে অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত পোস্ট দেখুন: ইন্সটাগ্রাম, টিকটক, এক্স, থ্রেডস

অন্যদিকে, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলকে উদ্ধৃত করে প্রচারিত আরেকটি ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে নামাজ পড়তে পারবে এবং ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিতরা প্রয়োজনে মতো এসে বায়তুল মোকাররমে পূজা দিতে পারবে।’


এই দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত কিছু পোস্ট দেখুন: এখানে, এখানে, এখানে, এখানে

একই দাবিতে অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত পোস্ট দেখুন: ইন্সটাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘ধানের শীষে ভোট দিলেই বেহেশতে যাওয়া যাবে’ এবং ‘ঢাকেশ্বরী মন্দিরে নামাজ পড়া ও বায়তুল মোকাররমে পূজা দেওয়া’ সংক্রান্ত বক্তব্য দুইটি সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতাদের নিজস্ব অভিমত নয়। প্রকৃতপক্ষে, ভিন্ন একটি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনার প্রেক্ষাপটে তারা এসব কথা উদাহরণ বা উদ্ধৃতি হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে বক্তব্যের আগের ও পরের অংশ কাটছাঁট করে নির্দিষ্ট কয়েক সেকেন্ডের অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। 


মিয়া মোহাম্মদ ইদ্রিসের বক্তব্য যাচাই

এই বক্তব্যের বিষয়ে অনুসন্ধানে ‘Tazu Miazi’ নামের একটি ফেসবুক পেজে গত ১৬ জানুয়ারি প্রচারিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওটির সঙ্গে আলোচিত দাবিতে ছড়ানো ভিডিওর মিল রয়েছে। ভিডিওটির ৬ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে মাইক্রোফোন হাতে বক্তা মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, ‘ঐদিন তাদের বড় এক নেতা বক্তব্য রাখছে কি—রোজা, নামাজ, হজ, যাকাত কিচ্ছু লাগবে না, ধানের শীষে ভোট দিলে বেহেশতে যাইতে পারবেন। আরে… দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে বেহেশতে যাইতে পারবেন। নাউজুবিল্লাহ বলেন সবাই। এই কথাটা যারা বলে এরাও জাহান্নামী, আর যারা যদি বিশ্বাস করে তারাও জাহান্নামী হবে।’

ওই ফেসবুক পেজটির পরিচিতিতে উল্লেখ রয়েছে, এটি এশিয়ান টিভি ও জাতীয় দৈনিক সকালের সময়-এর প্রতিনিধির পেজ। একই দিনে সেখানে বক্তব্যটির লাইভ সম্প্রচারও পাওয়া যায়। ভিডিওটির বিভিন্ন অংশে বিএনপি নেতা মিয়া মোহাম্মদ ইদ্রিসকে জামায়াতকে নিয়ে সমালোচনা করতে শোনা যায়।

ভিডিওটির ১ ঘণ্টা ২৬ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড থেকে তিনি বলতে শুরু করেন, ‘একটা কথা বলেন তো আপনারা। এখানে তো অনেক আলেম আছেন। জামায়াতে ইসলাম কি ইসলাম? যদি ইসলাম হয়, তাহলে ইসলামে কী আছে? পর্দা আছে না মা-বোনদের? তাহলে আমাদের হাদিসে কি নেই যে মা-বোনদের পর্দায় থাকতে হবে? আজকে ভোটের জন্য মা-বোনদের কেন পর্দার বাইরে বের করা হচ্ছে? কিসের জন্য বের করা হচ্ছে? ক্ষমতার লোভে। তাহলে কী হচ্ছে? এই যে গিয়ে মা-বোনদের বোঝানো হচ্ছে এভাবে ভোট দিলে কী…।’

এই বক্তব্যের পরপরই তিনি আলোচিত অংশটি বলেন।

বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, সমালোচনার প্রেক্ষাপটে কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রথমে অনিচ্ছাকৃতভাবে ‘ধানের শীষ’ উল্লেখ করলেও সঙ্গে সঙ্গেই তা সংশোধন করে ‘দাঁড়িপাল্লা’ বলেন।

অর্থাৎ, ধানের শীষে ভোট দিলে বেহেশতে যাওয়ার কথা তিনি নিজস্ব বক্তব্য হিসেবে বলেননি। বরং, জামায়াতের সমালোচনা করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে দাঁড়িপাল্লার পরিবর্তে ধানের শীষ বলে ফেলেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই তা সংশোধন করেন। তবে বক্তব্যের ওই অংশের আগের ও পরের প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে কেবল নির্দিষ্ট অংশটি কেটে নিয়ে সেটিকে তার উদ্ধৃতি হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।

হাবিব উন নবী খান সোহেলের বক্তব্য যাচাই

এই বক্তব্যের বিষয়ে অনুসন্ধানে বায়ান্ন টিভির ফেসবুক পেজে গত ১৬ জানুয়ারি প্রচারিত একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। ভিডিওটির সঙ্গে আলোচিত দাবিতে ছড়ানো ভিডিওর মিল রয়েছে। ভিডিওটির ৫ মিনিট ৬ সেকেন্ডে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘এরা সুযোগ পেলে এমনও কথা বলবে, এমনও ফতোয়া দেবে যে মুসল্লিরা প্রয়োজনে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে নামাজ পড়তে পারবে এবং ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিতরা প্রয়োজনে এসে বায়তুল মোকাররমে পূজা দিতে পারবে…।’

এই বক্তব্যের আগে তিনি বলেন, ‘আপনারা সবাই সজাগ থাকবেন। একটি গোষ্ঠী তাদের বিষাক্ত দাঁত ও হিংস্র নখ লুকিয়ে রেখে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন কথা বলছে। কখনো মুসলমানদের সভায় গিয়ে বলে তারা বেহেশতের ব্যবস্থা করে দেবে আবার অন্য ধর্মের মানুষদের কাছে গিয়ে বলে আমরা কোনো শরিয়া আইন চালু করব না। তাদের লক্ষ্য একটাই যেকোনোভাবে ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের আসল চেহারা জনগণের সামনে তুলে ধরা। কিন্তু সেই ভয়ংকর চেহারা এই জাতি আর দেখতে চায় না। ইনশাআল্লাহ ভোটের মাধ্যমেই জাতি তাদের প্রত্যাখ্যান করবে।’

বাংলানিউজ২৪-এর ইউটিউব চ্যানেলে একই বক্তব্যের ভিডিওর শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, ‘ক্ষমতায় যেতে তারা ঢাকেশ্বরী মন্দিরে নামাজের ফতোয়াও দিতে পারে : সোহেল’। ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৬ জানুয়ারি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

অর্থাৎ, হাবিব উন নবী খান সোহেলের বক্তব্যটিও তার নিজস্ব অভিমত নয়। বরং, অন্য একটি রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি কথাগুলো বলেন। তবে বক্তব্যের ওই অংশের আগের ও পরের প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে কেবল নির্দিষ্ট অংশটি কেটে নিয়ে সেটিকে তার উদ্ধৃতি হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।

সুতরাং, ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করতে গিয়ে উদাহরণ হিসেবে বলা বিএনপির দুই নেতা মিয়া মোহাম্মদ ইদ্রিস ও হাবিব উন নবী খান সোহেলের বক্তব্যের ভিডিও কাটছাঁট করে সেগুলো তাদের নিজস্ব বক্তব্য দাবি করে প্রচার করা হচ্ছে; যা বিভ্রান্তিকর।

তথ্যসূত্র

আরও পড়ুন

spot_img