শনিবার, ফেব্রুয়ারি 7, 2026

শেখ হাসিনার রায়কে ঘিরে ট্রাম্প-গুতেরেস-তুর্কের মন্তব্য দাবিতে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও প্রচার

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গত ১৭ নভেম্বর এ রায় ঘোষণা করে।

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, সামাজিক মাধ্যমে এই রায়ের বিপক্ষে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের বক্তব্য দাবিতে অন্তত একটি করে এআই-তৈরি ভিডিও ছড়ানো হয়েছে।

দাবি ১

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য দাবিতে একটি ভিডিও ছড়িয়েছে। ভিডিওতে ট্রাম্প-সাদৃশ্য এক ব্যক্তিকে ইংরেজিতে বলতে শোনা যায়, ‘ইউনূস শেখ হাসিনাকে বিচার করতে পারেন না, কারণ তিনিই নিজে বৈধ নন। শেখ হাসিনা কোনো যুদ্ধাপরাধী নন, যে তাকে সেই আদালতে বিচার করা হবে; ওই আদালত স্বাধীনতার বিরোধীদের জন্য।’ ভিডিওটি প্রচারিত হয়েছে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামটিকটকে। 

Screenshot: Facebook. 

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে শেখ হাসিনার রায়ের পর ড. ইউনূস ও শেখ হাসিনাকে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন কোনো বক্তব্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ২০২০ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি নিবন্ধে প্রকাশিত ট্রাম্পের ছবির সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর শুরুর দৃশ্যের মিল পাওয়া গেছে। উভয় ক্ষেত্রেই তাকে একই পোশাক, ব্যাকগ্রাউন্ড ও হাততালির ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

Comparison: Rumor Scanner

ভিডিওটি বিশ্লেষণেও বেশ কয়েকটি অসংগতি ধরা পড়ে। ১৮ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দুটি কাট শনাক্ত করা গেছে, প্রথমটি ৬ সেকেন্ডের এবং দ্বিতীয়টি ১২ সেকেন্ডের; অর্থাৎ ভিডিওটি তিনটি ৬ সেকেন্ডের অংশ জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা। প্রতিটি অংশেই ট্রাম্প-সাদৃশ্য ব্যক্তিকে একই হাত তালি দেওয়ার ভঙ্গি থেকে বক্তব্য শুরু করতে দেখা যায় এবং কণ্ঠস্বরে এআই-জনিত কৃত্রিমতা লক্ষ্য করা যায়।

অতিরিক্ত যাচাইয়ের জন্য ভিডিওটি এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম হাইভ মোডারেশনে পরীক্ষা করা হলে, এটি এআই-তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯২ শতাংশ বলে শনাক্ত হয়।

Screenshot: Hive Moderation.

অর্থাৎ, এআই দিয়ে তৈরি একটি ভিডিওকে শেখ হাসিনার রায়ের পর ড. ইউনূস ও শেখ হাসিনাকে ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।

দাবি ২

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্য দাবিতে একটি ভিডিও ছড়িয়েছে। ভিডিওতে আন্তোনিও গুতেরেস-সাদৃশ্য এক ব্যক্তিকে ইংরেজিতে বলতে শোনা যায়, ‘শেখ হাসিনার বিচারের রায় ভুয়া, এখানে পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। বিশ্বের কোনো দেশ এই রায়কে সমর্থন করে না। ইউনুস অবৈধ এবং তার বিচারও অবৈধ।’ ভিডিওটি প্রচারিত হয়েছে ফেসবুকে

Screenshot: Hive Moderation.

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে শেখ হাসিনার রায়ের পর ড. ইউনূস ও শেখ হাসিনাকে ঘিরে আন্তোনিও গুতেরেসের এমন কোনো বক্তব্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং তার এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টের প্রোফাইল পিকচার হিসেবে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর শুরুর দৃশ্যের মিল দেখা যায়। ছবিতে ভলকার তুর্কের পরিহিত পোশাক, ব্যাকগ্রাউন্ড ও মুখভঙ্গির হুবহু মিল দেখা যায়। 

Comparison: Rumor Scanner

আলোচিত ভিডিও বিশ্লেষণেও বেশ কয়েকটি অসংগতি ধরা পড়ে। ১২ সেকেন্ডের এই ভিডিওতেও ৬ সেকেন্ডে একটি কাট দেখা যায়। বক্তব্যের সময় মুখ ও হাতের নড়াচড়ায় অস্বাভাবিকতা এবং কণ্ঠস্বরেও কৃত্রিমতা দেখা যায়।

বিষয়টি আরও যাচাই করতে ভিডিওটি এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম হাইভ মোডারেশনে পরীক্ষা করা হলে, এটি এআই-তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ শতাংশ বলে শনাক্ত হয়।

Screenshot: Hive Moderation.

অর্থাৎ, এআই দিয়ে তৈরি একটি ভিডিওকে শেখ হাসিনার রায়ের পর ড. ইউনূস ও শেখ হাসিনাকে ঘিরে আন্তোনিও গুতেরেসের বক্তব্য দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।

দাবি ৩

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের বক্তব্য দাবিতে একটি ভিডিও ছড়িয়েছে। ভিডিওতে ভলকার তুর্ক-সাদৃশ্য এক ব্যক্তিকে ইংরেজিতে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা মনে করি শেখ হাসিনার বিচার আসলে বিচারিকভাবে ড. ইউনূসের নিজের বিচার। বাংলাদেশের ৮০% মানুষ শেখ হাসিনার রায়ের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। ইউনূস তার ক্যাংগারু কোর্টে শেখ হাসিনাকে বিচার করেছেন।’ ভিডিওটি প্রচারিত হয়েছে ফেসবুকটিকটকে

Screenshot: Facebook. 

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে শেখ হাসিনার রায়ের পর ড. ইউনূস ও শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভলকার তুর্কের এমন কোনো বক্তব্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং অন্তত ২০২৩ সাল থেকে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমের ব্যবহার হওয়া ফিচার ইমেজের (,,) সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর শুরুর দৃশ্যের মিল দেখা যায়। ছবিতে ভলকার তুর্কের পরিহিত পোশাক, ব্যাকগ্রাউন্ড ও মুখভঙ্গির সঙ্গে ভিডিওটির হুবহু মিল রয়েছে।

Comparison: Rumor Scanner

এই ভিডিও বিশ্লেষণেও বেশ কয়েকটি অসংগতি ধরা পড়ে। ট্রাম্পের ভিডিওর মতো ১৭ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে ৬ সেকেন্ড ও ১২ সেকেন্ডে দুটি কাট শনাক্ত হয়। ভিডিওর একটি ফ্রেমে তুর্ক-সাদৃশ্য ব্যক্তির কিছু দাঁত অদৃশ্য, আরেক ফ্রেমে সেই জায়গায় দাঁত দেখা যায়। ভিডিওটির কণ্ঠস্বরেও এআই-জনিত কৃত্রিমতা লক্ষ্য করা যায়।

বিষয়টি আরও যাচাই করতে ভিডিওটি এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম হাইভ মোডারেশনে পরীক্ষা করা হলে, এটি এআই-তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৮৫ শতাংশ বলে শনাক্ত হয়।

Screenshot: Hive Moderation

অর্থাৎ, এআই দিয়ে তৈরি একটি ভিডিওকে শেখ হাসিনার রায়ের পর ড. ইউনূস ও শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভলকার তুর্কের বক্তব্য দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের অনুপস্থিতিতে বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। পৃথক পৃথক বিবৃতিতে মানবাধিকার নিয়ে এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুইজনের অনুপস্থিতিতেই বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং তাদের পছন্দের আইনজীবী দেওয়ার সুযোগ ছিল না যেটি গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়, এই মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরোধিতা করেছে, কেননা দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের সাজা বাতিলের আহ্বান জানিয়ে আসছে জাতিসংঘ। তবে, এই রায়কে ‘ভুক্তভোগীদের জন্য একটি মুহূর্ত’ বলে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়।

তথ্যসূত্র

আরও পড়ুন

spot_img